মোঃ গোলাম মোর্শেদ শিবলী,
গত শুক্রবার সম্ভবত সেদিন তারিখ ছিল-১৫-৯-২০২৩ ছেলেটার এলোমেলো জীবন যাপনের জন্য এলাকার মুরব্বিরা তাবলীকে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললেন। আমিও ভাবলাম যদি পরিবর্তন হয়। ওনাদের কথায় পাঠালাম ৪/৫ দিন পর ফোন আসলো জ্বর খুব দ্রুত আমাকে যেতে হবে। তাবলিকের মুরুব্বীদের আমি বললাম ওকে একটু ডাক্তার দেখান ঔষধ খাওয়ান। যাহোক ওকে ঔষধ খাওয়ানো হয়েছিল কিন্তু কোন ভাবেই ওর জ্বর নাম ছিল না।
এবার আবার ফোন ভাই আপনার ছেলেকে নিয়ে যান খুব খারাপ অবস্থা ওদের জামাত ছিল ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলায়। একদিকে ছেলের ভয়াবহ অসুস্থতা অন্যদিকে রাত্রি বারোটা আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না ভোলা তো বাংলাদেশের শেষ প্রান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক খারাপ হঠাৎ করে একজন রিলেটিভ এর নাম মনে পড়ল। আমি তার কাছে কল করলাম আমার সবকিছু খুলে বললাম বললাম তুমি যদি আমাকে একটু হেল্প করতে পারো কারণ ওনার শ্বশুরবাড়ি ভোলাতে ছিল।
যাক সে আশা দিয়েছিল পরে আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়তো হয়নি ফলে বাড়ি থেকে পারিলা গ্রামের আংকেল রাজুকে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে রাজশাহীতে রওনা দিলাম। অনিশ্চয়তার পথে তবে রাজশাহী গিয়ে একটি বাস পেলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম যদিও তখন বাস পাওয়ার কথা ছিল না। যাচ্ছিলাম আর আমার প্রিয় নেতা প্রিয় ভাই আবু বক্কর ভাইয়ের কাছ থেকে ভোলাতে যাওয়ার দিকনির্দেশনা গুলো নিচ্ছিলাম। ওনার দিকনির্দেশনায় আমি অনেকটা উপকৃত হয়েছি না হলে হয়তো আরো বিপদ হতে পারতো।
সদরঘাট পৌঁছে লঞ্চে উঠলাম সত্যিই আমার এই জার্নিটা ছিল ভীষণ কষ্টকর ভীষণ অনিশ্চয়তায় ভরা আমি যদি লিখি অনেকগুলো লিখতে হবে তাই সংক্ষেপে শুধু একটি কথায় জীবনে এত কষ্টের জার্নি আমার জীবনে কখনো করিনি বলা যায় এক অভিজ্ঞতায় ভরা এই জার্নি।
দীর্ঘ ছয় ঘন্টা জার্নির পরে আমাকে নামিয়ে দেওয়া হলো ভোলা ইলিশা ঘাট। আমাকে সেখান থেকে যেতে হবে দৌলতখান থানা আদর্শ মসজিদ কারণ ওদের জামাত আছে দৌলতখান থানায়। কিভাবে যাব ভাবছি চিন্তায় পড়ে গেলাম এবার দৌলতখান থানার যে ইউনিয়নে আমার ছেলেটার জামাত আছে সে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেবকে পেলাম। উনি আমার দলীয় ভাই আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন উনি আমাকে অটো ঠিক করে দিলেন এবং অটো চালককে বললেন তুমি ভাইকে সঠিক ঠিকানায় নামিয়ে দিয়ে আসবে। এবার অটোচালক আমাকে দৌলতখান উপজেলার উদ্দেশ্যে নিয়ে চললেন-
সেখানে গিয়ে প্রায় তিন ঘন্টা মসজিদ খুঁজে পাচ্ছিলাম না পরে অনেক চেষ্টার পর এক অটোচালক বললেন আমি চিনি।
এবার অটো চালককে বললাম ভাই তুমি আমার জন্য অনেক করেছো আমি এই অটোতে যাই অটোচালক বললেন আপনাকে রেখে যেতে ভয় করছে আমি বললাম তুমি যাও ভাই উপরে আল্লাহ আছেন উনি আমাকে দেখবেন তুমি দোয়া করো।
এবার যে অটোতে উঠলাম উনিও ভালোভাবে চিনছিলেন না যাই হোক এবার পেয়ে গেলাম সেখানে গিয়ে বাচ্চাটার অবস্থা দেখে অনেক কষ্ট হলো। যাহোক ওকে নিয়ে রওনা হলাম বাড়ি ফেরার জন্য দৌলতখান ঘাটে এবার লঞ্চের অপেক্ষায়-হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠলো আমি যেন বুঝতে পারছিলাম না কি হলো আমি ভাবলাম আমার বোধহয় বাড়ি ফেরা হবেনা। কিছু মানুষের সেবায় মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আমি একটু সুস্থ হলাম। অনেক পরে একটি লঞ্চ আসলো সেখানে মানুষ ওঠার মত কোনো পরিবেশ ছিল না নিজে অসুস্থ, ছেলেটা অসুস্থ, কি করি সব মিলে অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন ভাবলাম (ফি আমানিল্লাহ) রওনা হই যা হবে ইনশাল্লাহ আল্লাহ তো আছেন। এমন একটি লঞ্চ পেলাম যে লঞ্চ প্রতিটা স্টেশনে থামছে গরুর গাড়ির চেয়েও আস্তে আস্তে চলছে এদিকে আমি নিজে অসুস্থ ছেলেটা অসুস্থ শত চেষ্টা করেও কেবিনের ব্যবস্থা করতে পারলাম না সিট তো নেই কি বলবো এ অভিজ্ঞতা যেন এক নির্মমতায় ভরা। এবার লঞ্চ থেকে সদরঘাটে যখন নামলাম নেমে ছেলেটাকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সাত নাম্বার গাড়িতে কল্যাণপুর আসলাম। এসে হানিফ টিকেট কাউন্টারে আল্লাহর রহমতে টিকেট পেয়েও গেলাম। এবার রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা মাঝে মাঝে জ্যাম বাচ্চাটা বারবার অস্বস্তি বোধ করছিল যাহোক অবশেষে রাজশাহী পৌঁচ্ছালাম। এবার অটো চালকের কথা না লিখলে নিজে হয়তো অকৃতজ্ঞ হব-আমি আগেই বলেছি আমার সহযোদ্ধা এক চেয়ারম্যান সাহেবের কথা যে আমাকে হেল্প করেছেন। উনি অটোওয়ালাকে বললেন এই অটো যাবে নাকি?
- যাব ভাই কোথায় যেতে হবে,(ইলিশা ঘাঁটি থেকে দৌলতখান উপজেলায়) কত দিবো?
- ৫০০ টাকা দিয়েন ভাই।
এবার উঠে পড়লাম। উঠতে না উঠতেই হঠাৎ খারাপ লাগল।
কারন অটো টা ভালো ছিলনা, ইচ্ছা হচ্ছিলো অটো থেকে নেমে যাই, কিন্তু সারাদিনের ক্লান্ত- সময় পার করার পর আমারো নামার মতো অবস্থা ছিলনা সত্যিই। যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম,
ভাই অটোর এ অবস্থা কেন? এভাবে কি তুমি যেতে পারবে?
- পারমু ভাই, আমার তো চালাইতেই হবে।
(আমার আবেগ টা যতটা সত্যি ততটাই সত্যি ছিলো ওর বাস্তবতা)
এরপর, জিজ্ঞেস করলাম - বাসায় কে কে আছে?,
বলল- মা, আমি,এক বুইন।
তোমার বাবা কই?
- বলল বাবা মারা গেছে।
তোমার মা কোনো কাজ করেন না?
(এবার বাস্তবতা আরো নিষ্ঠুর)
- ভাই, মা অসুস্থ্য!
কেন, কি সমস্যা?
- ভাই, মায়ের কিডনি নষ্ট, ভোলার ডাক্তার ঢাকা নিতে কইছিলো, ঢাকার ডাক্তার রা কইছে তোমার মা বাঁচবেনা।
এর থেকে আর কিছু নির্মম হতে পারেনা যে, মায়ের বাঁচার সম্ভাবনা নেই তা সন্তান জানে।
বললাম, অটো তো ভাঙা, একটা নতুন অটো নিতে পারো। মায়ের ঔষধ কেনা লাগে, টাকায় হয়না। শুনছিলাম মানুষের জীবনে হতাশা কি হতে পারে, তার জীবনে কষ্টের রেল লাইনের গতি কতটা দ্রুত হতে পারে!
জীবন সংগ্রামে ছোট্ট এই ছেলেটা প্রতিনিয়ত হেরে গিয়েও একবার ও হাল ছেড়ে দিচ্ছেনা!
না সে আমাদের মত এত শিক্ষিত নয়, হ্যাঁ সে অশিক্ষিত, কিন্তু তার বিবেক আমাদের শিক্ষিত সমাজের থেকে অনেক এগিয়ে।
যখন দিনে দিনে বৃদ্ধাশ্রম গুলো বেড়ে চলছে তখন মা এর প্রতি এই ভালোবাসা আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যে ছেলেটা জানে তার মা বাঁচবেনা সে তবুও প্রতিদিন ৫০০ টাকার ঔষধ কেনার চেষ্টা করছে এই আশায় হয়ত মা বেঁচে যাবেন। কষ্টে চোখে জল এসে যাচ্ছিলো ওর জীবনের গল্প শুনে।
এবার আমার ছেলের কথা ভাবছিলাম। তাদের সামনে অনাবিল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাল ছেড়ে দেয়, তাদের জন্য ঐ অশিক্ষিত শিশু অটো ওয়ালার থেকে শেখার আছে। থেকে নেমে, আমার পকেটে অল্প টাকা ছিল কারণ হঠাৎ রওনা দিয়েছিলাম আবার ফিরতে হবে তারপরেও যতটুকু পারলাম দিলাম ভাবলাম পরবর্তীতে যেতে হবে আল্লাহ আছেন , বললাম ভাইয়া আমারো সামর্থ্য কম, তবে ইচ্ছা অনেক বেশি, থাকলে তোমাকে আরো কিছু টাকা দিতাম। আমাদের সমাজে এমন ঘটনা অসংখ্য প্রতিনিয়ত ঘোরে ফিরে ঘটে।
মানুষ মানুষের জন্য সুতরাং দয়া করে
অসহায় মানুষের বিশেষ করে ঝরে পড়া মানুষদের সাহায্য করুন এবং তাদের প্রতি মানবিক হোন।
৫৭০/১ স্টেডিয়াম রোডে মানিকগঞ্জ - ১৮০০থেকে প্রকাশিত। ফোন -০১৯৬৮৮০০৯৩০
ইপেপার