রাজশাহীর দুর্গাপুরে ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় সুপারভাইজার পদে আটজন এবং তথ্য সংগ্রহকারী পদে ৮৫ জনের নাম রয়েছে। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় তদবিরের মাধ্যমে অনেক অযোগ্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যরা স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন নিয়োগে বঞ্চিত বিএনপির একাংশের নেতাকর্মী।
এ ছাড়া চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ তালিকায় একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার থাকা এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
রোববার (৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে বিভিন্ন পোস্ট দিতে দেখা যায় স্থানীয়দের।
<span;>সুত্রে জানা গেছে, সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত আট জনের মধ্যে দুইজন সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত। বাকি ছয়জন রাজনৈতিক বিবেচনা ও দলীয় তদবিরে হলেও তাদের মধ্যে তিনজন আওয়ামী লীগ সমর্থিত পরিবার। রাজনৈতিক পরিচয়ে সুবিধাপ্রাপ্তরা পৌরসভায় ছাত্রদলনেতা নাসির উদ্দিন বিদ্যুৎ এবং দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এ.সাত্তারের ছেলে রবিন উদ্দিন। দলীয় নেতাদের তদবিরে তিনজন হলেন- নওপাড়া ইউনিয়নে শেখ ইমতিয়াজ আহম্মেদ। ঝালুকা ইউনিয়নে শাকিব উদ্দিন ও মাড়িয়া ইউনিয়নে আশরাফুল ইসলাম। বাকী তিনজন হলেন- পানানগর ইউনিয়নের লিলি খাতুন, কিসমতগনকৈড় ইউনিয়নের নাসির উদ্দিন এবং জয়নগর ইউনিয়নের নাহিদ হাসান। তারা আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পরিবারের সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও নিয়োগে বঞ্চিতরা। তবে তিনজনই দাবি করেন মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের <span;>পরিবার ছাড়া নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কোন পদ-পদবীর তথ্য নিশ্চিত করেনি অভিযোগকারীরা।
<span;>
তথ্য সংগ্রহকারী পদে চুড়ান্ত নির্বাচিত ৮৫ জনের তালিকাতেও রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি এ পদে অনেকেই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পরিবারের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন।
এ পদে দুর্গাপুর পৌরসভা বিএনপির সাবেক সভাপতির আব্দুল আজিজ মন্ডলের মেয়ে সাদিয়া নাজনীন নির্বাচিত হয়েছেন। এ নিয়ে ছাত্রদলের এক নেতা ফেসবুক ওয়ালে প্রতিবাদ জানিয়েছে৷
জয়নগর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী পদে চুড়ান্ত তালিকায় আওয়ামীলীগ সমর্থক আলো নাজনীন নির্বাচিত হয়েছেন, তার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। অপেক্ষমাণ তালিকায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেনের নামও রয়েছে। এ তালিকায় শ্যামলী খাতুন নামে একই ব্যক্তির নাম দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে নওপাড়া ইউনিয়নে মিজানুর রহমান নামে একজন ভাইভা পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পানানগর ইউনিয়নে চুড়ান্ত তালিকায় আওয়ামী পরিবারের জেনিফা আক্তার ও সৈকত ইসলাম এবং অপেক্ষামান তালিকায় শিউলি বেগম।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বঞ্চিত ও স্থানীয়দের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। নওপাড়া ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা বাচ্চু মিয়া তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যেগুলোর নাম প্রকাশিত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই সুপারিশপ্রাপ্ত।’ অন্য এক মন্তব্যে তিনি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তার এসব পোস্টে নিয়োগে বঞ্চিত একাধিক পরীক্ষার্থীও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কিসমতগনকৈড় ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুশফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা ভালো দেওয়ার পরও তিনি নির্বাচিত হননি। অথচ আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত নাসরিন খাতুন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের সুপারিশে নির্বাচিত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
পানানগর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত লিলি খাতুনকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পরিবারের সদস্য দাবি করে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি কর্মী-সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিয়োগে বাদ পড়া রায়হান নাবু, বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত জহুরুল ইসলাম তাদের ফেসবুক পোস্টে লিলি খাতুনের নাম উল্লেখ করে ফলাফলের স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। সেখানে তারা নিয়োগের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জয়নগর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত নাহিদ হাসানকেও আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য দাবি করেছেন কয়েকজন নিয়োগে বঞ্চিত পরীক্ষার্থী। সংবাদ পত্রে নেতার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অভিযোগ করেন- উপজেলা বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতার সুপারিশে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
<span;>দুর্গাপুর পৌরসভার সাবেক ছাত্রদল নেতা সাইদুর রহমান সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি দুইবার ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। যারা সুপারভাইজার পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমিও একই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। ফলাফল, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় আমি এগিয়ে থাকার পরও কেন বাদ পড়লাম—এ প্রশ্নের উত্তর চাই।’
<span;>তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত তালিকায় যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি ইউএনও উম্মে হাবিবা ফারজানা ও সদস্য সচিব উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আ.ন.ম. রাকিবুল ইউসুফ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কতটুকু স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন, সেটি নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।’
<span;>নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রদলের দায়িত্ব এক নেতা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই প্রকল্পে যদি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন—তা আমার বোধগম্য নয়। বিএনপির কিছু নেতা দলকে বিতর্কিত করতে ৫ আগস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রত্যয়ন দিয়ে আসছেন। একইভাবে তারা এই নিয়োগেও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ নিশ্চিত করেছেন বলে আমরা মনে করি।’
সাধারণ পরীক্ষার্থীদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ লিখেছেন, নিয়োগে যদি রাজনৈতিক সুপারিশই প্রাধান্য পায়, তাহলে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অর্থ ও সময় নষ্ট করার প্রয়োজন ছিল না।
তবে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আ.ন.ম. রাকিবুল ইউসুফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো নির্বাচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বাদ দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী নিয়োগ পক্রিয়া সম্পূর্ণ এবং কোন ধরনের দলীয় তদবির ছাড়া মেধাবী ও যোগ্য পার্থীকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তবে এদের মধ্যে বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তকে বাতিল করা হবে।
এ বিষয়ে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ধরনের দলীয় তদবির ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। তবে নির্বাচিতদের মধ্যে কেউ বিতর্কিত বা অযোগ্য প্রমাণিত হলে তার নিয়োগ বাতিল করা হবে।
৫৭০/১ স্টেডিয়াম রোডে মানিকগঞ্জ - ১৮০০থেকে প্রকাশিত। ফোন -০১৯৬৮৮০০৯৩০
ইপেপার