বিশেষ প্রতিনিধি,ময়মনসিংহঃ
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেটি অনুমতি ছাড়া কপি করে নিজেদের নামে প্রচার, পরে রহস্যজনকভাবে সরিয়ে ফেলা—এমন অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে অনলাইনভিত্তিক একশ্রেণির অনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে। সাংবাদিক মহলের আশঙ্কা, জনস্বার্থের সংবাদকে কেউ কেউ আর্থিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে যেমন প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আড়ালে থেকে যাচ্ছে মূল দুর্নীতির অভিযোগ।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ বিআরটিএর পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এমন নানা অভিযোগ সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র, সংরক্ষিত স্ক্রিনশট ও একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি অনুমতি ছাড়া প্রায় হুবহু কপি করে অন্য একটি অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পরে সেই সংবাদটি রহস্যজনকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। এর পর থেকেই সাংবাদিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন সরিয়ে ফেলা হলো সেই সংবাদ? জনস্বার্থে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল? কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ, নাকি অন্য কোনো সমঝোতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, অন্যের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা কেবল নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়; এটি মেধাস্বত্বেরও সুস্পষ্ট অবমাননা। আর যদি কোনো অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হয় যে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সংবাদ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তবে সেটি হবে সাংবাদিকতার নামে জনবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা।
তবে পুরো বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়—ময়মনসিংহ বিআরটিএর পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএ অফিসকে কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি দালালচক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। লাইসেন্স, ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন সেবা ঘিরে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কার্যক্রমের পেছনে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়, যার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হতে পারে, তবুও অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের বিকল্প নেই।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনস্বার্থ রক্ষা। কিন্তু যদি কোনো চক্র সেই অনুসন্ধানকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণমাধ্যম—তিনটিই।
তাদের মতে, একই সঙ্গে দুটি বিষয়ে জরুরি তদন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, অনুসন্ধানী সংবাদ অনুমতি ছাড়া প্রকাশ এবং পরে তা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, বিআরটিএর পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, দালাল সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলোকে ধামাচাপা না দিয়ে তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। কারণ, দুর্নীতি আড়াল করার প্রতিটি চেষ্টা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আরও দুর্বল করে।
এখন প্রশ্ন একটাই—বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কি নিরপেক্ষ তদন্তের মুখ দেখবে, নাকি সবকিছু আবারও চাপা পড়ে যাবে? সেই উত্তর খুঁজছে ভুক্তভোগী মানুষ, সাংবাদিক সমাজ এবং সচেতন নাগরিকরা।
৫৭০/১ স্টেডিয়াম রোডে মানিকগঞ্জ - ১৮০০থেকে প্রকাশিত। ফোন -০১৯৬৮৮০০৯৩০
ইপেপার