তসলিম সরকার ময়মনসিংহ থেকেঃ
গাজীপুরের টঙ্গী—দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। লাখো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এ অঞ্চলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শ্রম অধিদপ্তরের অধীন টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র। অথচ চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ প্রতিষ্ঠানটির বিশাল অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে অবহেলা, অযত্ন এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার নীরব সাক্ষী হয়ে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কামারপাড়া রোডের মুখে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি একসময় শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের অন্যতম ভরসাস্থল ছিল। বর্তমানে কেন্দ্রটির বড় একটি অংশ জরাজীর্ণ, অব্যবহৃত এবং কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে শতকোটি টাকার সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর অনেক অংশেই সময়ের নির্মম ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও জানালার কাচ ভেঙে গেছে, আবার কোথাও ছাদের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনগুলোর সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা দুটোই হারিয়ে যাচ্ছে।
পুরো চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে আগাছা, ঝোপঝাড় এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। অনেক স্থানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায় সীমিত পরিসরে কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সন্ধ্যার পর এলাকাটির চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা ভবনের বিভিন্ন অংশে সন্ধ্যার পর সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিত্যক্ত স্থাপনাগুলোতে মাদকসেবন, জুয়া ও বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে পারে। ফলে শুধু সরকারি সম্পদই নয়, স্থানীয় জননিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বর্তমানে এখানে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য চিকিৎসাসেবা, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা, শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রম, আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়। প্রতি বছর সাধারণত ৮ থেকে ১০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়, যেখানে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং সামাজিক কল্যাণ বিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে কেন্দ্রটির কার্যক্রম অলিম্পিয়া রোড এলাকায় ভাড়া করা ভবন থেকে পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতির আরও করুণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা আসমা আক্তার, সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তারসহ মোট ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। অনুমোদিত জনবল ১৩ জন হলেও দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টঙ্গীর মতো বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের বিপুল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং নতুন কার্যক্রম চালু করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অনুসন্ধানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশাল এলাকাজুড়ে কার্যকর নিরাপত্তা প্রহরী বা আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ বেদখল বা দখলচেষ্টার ঝুঁকিও বাড়ছে। রাতের বেলায় অপরিচিত ব্যক্তিদের অবাধ চলাচল স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থানের কারণে জমিটির বাজারমূল্য বর্তমানে অত্যন্ত বেশি।
ভূমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং এলাকাবাসীর ধারণা, জমি ও স্থাপনার সম্মিলিত মূল্য ৩০০ কোটির টাকারও বেশি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন নেই, তবে এত মূল্যবান সরকারি সম্পদ বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার নয়, বরং সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক চিত্রও তুলে ধরে।
টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তার বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার ও সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। ভবনের সংস্কার, নিরাপত্তা জোরদার এবং সেবার মানোন্নয়নের জন্য একাধিকবার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র যুগ্ম সচিব সাহা আব্দুল তারেক জানান, “টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অব্যবহৃত ভবনগুলো সংস্কার করে এখানে আধুনিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, শ্রমিক সহায়তা কেন্দ্র, নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা বহুমুখী সামাজিক কল্যাণ কমপ্লেক্স গড়ে তোলা যেতে পারে।
তাদের মতে, এতে একদিকে সরকারি সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের লাখো শ্রমিক সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি শ্রমিক কল্যাণ কার্যক্রমও নতুন মাত্রা পাবে।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি জরিপ পরিচালনা করে অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার, সীমানা প্রাচীর সংস্কার, নিয়মিত টহল ব্যবস্থা চালু, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পরিত্যক্ত অংশগুলো পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকা শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদের অপচয়েরও প্রতীক। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কবে এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে টঙ্গী শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রকে আবারও শ্রমিক কল্যাণের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
৫৭০/১ স্টেডিয়াম রোডে মানিকগঞ্জ - ১৮০০থেকে প্রকাশিত। ফোন -০১৯৬৮৮০০৯৩০
ইপেপার