আর্মেনিয়ায় কেন ভারতীয়রা প্রতারিত

Desk
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

ইশান কুমার গত বছরের শুরুর দিকে আর্মেনিয়া আসার সময় ভেবেছিলেন উন্নত জীবন পাবেন৷ ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলতে ইশান কুমার ছদ্মনামটিই বেছে নেন ভারতীয় এক নাগরিক৷ এক বন্ধুর পরামর্শে বিদেশে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি৷ কুমার বলেন, ‘‘সে বলেছিল আমি এখানে অনেক অর্থ উপার্জন করবো৷ মাসে এক লাখ টাকার (বাংলাদেশি টাকায়) মতো৷ সে বলেছিল এটা ইউরোপের একটি দেশ৷ কুমারের বন্ধু এক এজেন্টের মাধ্যমে তার জন্য আর্মিনিয়াতে আসার ব্যবস্থা করেন৷ এজন্য প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার৷ কথা ছিল একটি ডেলিভারি কোম্পানিতে চাকুরি হবে তার৷ তবে সেসব আলোচনা শুধু হোয়াটসঅ্যাপে হয়েছিল৷ কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি৷ তারপরও কুমার আর্মেনিয়া আসার সিদ্ধান্ত নেন৷ আর্মেনিয়ায় পৌঁছানোর পর ছয়মাসের জন্য তার গন্তব্য হয় দেশটির রাজধানী ইয়েরেভানের শহরতলী থেকে ত্রিশ মিনিট দূরত্বে চেরি হোটেলে৷ কুমার জানান, হোটেলটির বিভিন্ন কামড়ায় অনেক ভারতীয় কর্মী গাদাগাদি করে রাতে ঘুমান৷ কুমার দ্রুতই ডেলিভারি সার্ভিসে কাজ শুরু করেন৷ কিন্তু কাজের পরিবেশ তিনি যা প্রত্যাশা করেছিলেন সেরকম ছিল না৷ তারা বলেছিলেন পিক টাইমে অর্ডার প্রতি পাঁচশো টাকার মতো মিলবে৷ আর দিনের অন্যসময় মিলবে চারশো টাকার মতো৷ কিন্তু এখানে আসার পরে বুঝলাম ওটা প্রতারণা ছিল৷ তারা আমাদেরকে শুধুমাত্র তিনশো এবং ২০০ টাকা দেয়৷ তারপরও দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেছেন কুমার৷ এবং প্রথম মাসে তিনি তার প্রত্যাশার কাছাকাছি বেতন পেয়েছিলেন যা বাংলাদেশি টাকায় একলাখ টাকার মতো৷ তবে কুমার জানান, তিনি এই আয়ের সামান্য একটা অংশ জমাতে পারেন৷ দশজনের সঙ্গে একরুমে থাকার জন্য তার ভাড়া দিতে হয়৷ পাশাপাশি ডেলিভারি সার্ভিসের জন্য স্কুটার ভাড়া করতে হয় তাকে৷ কুমার জানান, এসব খরচও যে তাকে দিতে হবে সেটা ভারতে থাকতে তাকে জানানো হয়নি৷ সবকিছু দেয়ার পর আমার হাতে দেশে পাঠানোর জন্য বারো হাজার টাকার মতো থাকে,’’ বলেন তিনি৷ ভারতীয় কর্মীরা কেন আর্মেনিয়ায় যান? আর্মেনিয়ায় রুশদের পর সবচেয়ে বেশি ভারতীয় অভিবাসীর বাস৷ দেশটির অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ থেকে ত্রিশহাজার ভারতীয় দেশটিতে বসবাস করছেন৷ তাদের মধ্যে দুই হাজার ছয়শো জন শিক্ষার্থী৷ সেই সোভিয়েত আমল থেকেই ভারতীয়রা দেশটিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন৷ ভারতীয় নাগরিকদের আসা সহজ করতে ২০১৭ সালে আইনে পরিবর্তন আনে আর্মেনিয়া৷ তখন থেকে ভারতীয়দের সংখ্যা দেশটিতে বাড়তে শুরু করে৷ গতবছর দেশটিতে কাজের ভিসা পেয়েছেন তিন হাজার দুশো ভারতীয়৷ তার আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ৫৩০ আর ২০২১ সালে ৫৫ জন৷ তবে কুমারের মতো আরো অনেক কর্মী ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন যে তাদেরকে যে বেতনের কথা বলে আনা হয়েছিল সেই বেতন তারা পাচ্ছেন না৷ মোটের উপর ভালো চাকুরি দেয়ার কথা বলে নিয়োগদাতারাও তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে৷ কেউ কেউ দাবি করেছেন, তারা কুমারের চেয়েও বেশি প্রায় চার লাখ টাকার মতো খরচ করে আর্মেনিয়া পৌঁছেছেন৷ কারো কারো অভিযোগ, আর্মেনিয়াতে পৌঁছে শুরুতেই কাজ পাননি তারা৷ আবার এমন অভিযোগও আছে যে মাসের শুরুতে যে বেতন তাদের দেয়া হবে বলা হয়েছিল তা দেয়া হয়নি মাস শেষে৷ ভারতের কেরালা অঞ্চল থেকেই এসেছেন বেশিরভাগ কর্মী৷ সেখানকার অভিবাসন এবং উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান এস. ইরুদিয়া রাজন জানান যে গত শতকের সত্তরের দশক থেকে কেরালা থেকে বড় সংখ্যায় মানুষ অভিবাসন বেছে নিচ্ছেন৷ একসময় মূলত দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব এর পেছনে ভূমিকা রখেছে বলে মনে করেন তিনি৷ ‘‘তবে বর্তমানে যারা অভিবাসন বেছে নিচ্ছেন তাদের অধিকাংশই উচ্চাকাঙ্খী মধ্যবিত্ত যারা অন্য কোথাও উন্নত জীবন চাচ্ছেন,’’ বলেন তিনি৷ রাজন জানান, কেরালায় অনেক নিয়োগদাতা সংস্থা রয়েছে৷ ‘‘অভিবাসন একটি আশা৷ নিয়োগদাতা সংস্থাগুলো মানুষের কাছে স্বপ্ন বিক্রি করছে,’’ বলেন তিনি৷ তবে এই খাতে প্রতারণা বেশি হচ্ছে বলে মত তার৷ ফলে অনেকে তাদের খপ্পড়ে পড়ে বিদেশে গিয়ে উল্টো জীবনমানের অবনতি ঘটিয়েছেন৷ অভিবাসীরা এসব অভিযোগ ইয়েরেভানের ভারতীয় দূতাবাসকেও জানিয়েছেন৷ ডয়চে ভেলের তরফ থেকে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কেনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি৷ সুএ: লুইসে গ্লুম