নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের মিড নর্থ কোস্টে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নেভার নেভার নদী কেড়ে নিল দুই তরুণের প্রাণ। গত ২৫ জানুয়ারি গ্লেনিফার এলাকায় জনপ্রিয় এই নদীতে ডুবে মারা যান ৩১ বছর বয়সী সচিন খিল্লান ও ৩২ বছর বয়সী সাহিল বাত্রা। এই ঘটনায় গভীর শোক নেমে এসেছে ভারতীয় অস্ট্রেলীয় কমিউনিটিতে, একই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নদীতে গোসল ও হাঁটার ঝুঁকি এবং সাঁতার–নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার জরুরি প্রয়োজন।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে সিডনি থেকে গ্লেনিফারে গিয়েছিলেন সচিন ও সাহিল। তারা যে আবাসনে উঠেছিলেন, সেখান থেকে নেভার নেভার নদীতে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ ছিল। প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে দলটি নদীর তলদেশ ধরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তারা জিন্স ও টি-শার্ট পরা অবস্থায় ছিলেন এবং পানির গভীরতা বাইরে থেকে খুব বেশি মনে হচ্ছিল না, নদীর পানির মধ্য দিয়েই নিচের জমি দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু শান্ত সেই মুহূর্তটি এক নিমিষেই ভয়াবহ রূপ নেয়। হঠাৎ করে নদীর ভেতরের একটি গভীর গর্তে পিছলে পড়েন সচিন ও সাহিল। দলের এক সদস্য ফিরে তাকিয়ে দেখেন, দু’জনই পানির নিচে টেনে নেওয়া হচ্ছে। সচিন খিল্লানের বাগদত্তা এবং দলের আরেক সদস্য তাদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়লেও প্রবল স্রোতে তারাও বিপদে পড়েন।
“যেই না সে একজনকে ধরতে পানিতে নামল, সেও ডুবে যেতে শুরু করল—তাদের নিচের দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছিল,” বলেন সাহিল বাত্রার শ্যালক সুমিত সিন্ধু।
পাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে এসে কয়েক মিনিট পর দু’জনকে নদী থেকে তুলে আনতে সক্ষম হলেও ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। সাহিল বাত্রার স্ত্রী ও আরেকজন পুরুষকে সাময়িক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়; পরে সেদিন সন্ধ্যায় তারা ছাড়া পান।
দু’জনই ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কাজের উদ্দেশ্যে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তারা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একে অপরের পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন। “ভারতে থাকা পরিবারের দায়িত্ব তারা কাঁধে নিয়েছিলেন—দু’জনেরই বাবার হৃদরোগজনিত সমস্যা ছিল,” বলেন সুমিত সিন্ধু।
সচিন খিল্লানের বোন অনুরাধা খিল্লান জানান, সিডনির নোভা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে তিনি একজন প্রিয় কার্পেন্ট্রি শিক্ষক ছিলেন। “তার শিক্ষার্থীরা বাড়িতে এসে শুধু কাঁদছে, কথা বলার ভাষা নেই। সে ছিল একেবারে রত্নের মতো মানুষ, তাকে কেউই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না,” বলেন তিনি।
সাহিল বাত্রা সিডনিতে একজন আইটি পেশাজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সদ্য, গত ডিসেম্বরেই, অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেয়েছিলেন। তার স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা-কটি নতুন জীবনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারটি মুহূর্তেই নেমে আসে গভীর শোকে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দু’জনই স্বভাবগতভাবে সতর্ক ছিলেন এবং প্রাথমিক সাঁতার জানতেন। “তারা বাঁচতে চেয়েছিল, জীবন উপভোগ করতে চেয়েছিল,” বলেন এক স্বজন। “মৌলিক সাঁতার না জানলে তারা কখনোই পানিতে নামত না।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী মানেই ভিন্ন ঝুঁকি। রয়্যাল লাইফ সেভিং এনএসডব্লিউ-এর ড্রাউনিং প্রিভেনশন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার ক্রেইগ রবার্টস বলেন, “অস্ট্রেলিয়ায় ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে সাধারণ স্থান হলো নদী। প্রবাহমান পানি এবং পানির নিচে কী রয়েছে, তা চোখে দেখা যায় না, অথচ সেগুলোই সবচেয়ে বিপজ্জনক। গরমে মানুষ ঠান্ডা হতে চায়, আর এই লুকানো ঝুঁকিগুলোই প্রাণ কেড়ে নেয়।”
পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর বড় একটি অংশ ঘটে উপমহাদেশ থেকে আসা মানুষের ক্ষেত্রে-যাদের অনেকেই নদীর আচরণ, স্রোত ও পানির নিচের গর্ত সম্পর্কে অভ্যস্ত নন। তাই বিশেষজ্ঞদের জোরালো আহ্বান-দক্ষ সাঁতার জানা না থাকলে বা লাইফ জ্যাকেট ছাড়া নদী, লেক কিংবা সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকতে হবে; গরমে স্বস্তির খোঁজে এক মুহূর্তের অসতর্কতা যেন জীবনের শেষ সিদ্ধান্তে পরিণত না হয়।
নেভার নেভার নদীর এই নীরব ট্র্যাজেডি আজ শুধু দুই পরিবারের শোক নয়, এটি একটি কঠিন সতর্কবার্তা। জীবন অমূল্য; সাঁতার জানা কতটুকু, আর পানির ঝুঁকি কতটা, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা ও মানাই পারে ভবিষ্যতে এমন শোককে রুখে দিত
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST