নিশাদুল ইসলাম নিশাদ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:শীতের স্নিগ্ধ সকালে কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য উঁকি দিতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হয় এক অন্যরকম কর্মচাঞ্চল্য। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলির ঘ্রাণে ম ম করতে থাকে পুরো ক্যাম্পাস।
আধুনিকতার যান্ত্রিকতায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে তরুণ প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তুলতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আয়োজিত হয় এই বিশাল পিঠা উৎসব।
উৎসবটি উদ্বোধন করেন কলেজের সুযোগ্য অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু জাফর মোহাম্মদ আরিফ হোসেন । উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজের সংস্কৃতি ও শেকড়কে চেনার মধ্যেই প্রকৃত শিক্ষা নিহিত। তিনি শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই উৎসবকে বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব হিসেবে অভিহিত করেন।
উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল মাঠজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো শিক্ষার্থীদের বাহারি স্টলগুলো। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ স্টলকে গ্রামীণ আবহে সাজিয়ে তোলার প্রতিযোগিতায় মেতেছিলেন।
বাঁশের বেড়া, খড়ের চালা, শিকা আর মাটির সানকির ব্যবহারে স্টলগুলোতে ফিরে এসেছিল সেই চিরচেনা গ্রাম্য রূপ।
স্টলগুলোতে শোভা পাচ্ছিল বাংলার বিচিত্র সব পিঠা। ভাপা, চিতই আর পাটিসাপটার মতো চিরচেনা পিঠার পাশাপাশি ছিল নকশি পিঠা, পুলি পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, গোলাপ পিঠা, সুজি সরা, মুগ পাকন এবং হৃদয় হরণ।
অনেক বিলুপ্তপ্রায় পিঠা, যা এখন আর সচরাচর দেখা যায় না, সেগুলোও শিক্ষার্থীরা পরম মমতায় তৈরি করে উৎসবে প্রদর্শন করেন।
প্রতিটি পিঠার পেছনে ছিল শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রবল আকাক্ষা।
শিক্ষার্থীদের পরনে ছিল বাসন্তী ও লাল-সাদা রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি, যা উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এই উৎসবে যোগ দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।
শিক্ষকদের অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় আসেন এবং শিক্ষার্থীদের হাতের তৈরি পিঠার স্বাদ গ্রহণ করেন। পিঠা বিক্রির পাশাপাশি প্রতিটি স্টলের সামনে চলল আড্ডা, গান আর সেলফি তোলার ধুম। প্রযুক্তির যুগে আমাদের নিজস্ব মিষ্টান্ন যে পশ্চিমি ফাস্টফুডের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও সুস্বাদু, তা এই উৎসবের ভিড় দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে কলেজ মিলনায়তনে আয়োজিত হয় একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে গ্রাম বাংলার জারি-সারি ও লোকসংগীতের সুর লহরি পুরো এলাকাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। পিঠার স্বাদ আর সুরের মূর্ছনা মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল এই উৎসবে।
দিনশেষে যখন মেলা ভাঙল, তখন সবার চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের এই পিঠা উৎসব কেবল একটি একদিনের আয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল তরুণ হৃদয়ে স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ ও সংস্কৃতিকে লালন করার এক নতুন শপথ।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST