নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
পদ্মা নদী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীটির প্রস্থ বাড়ছে, বদলাচ্ছে গতিপথ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নদীতীরবর্তী জনপদের ওপর। বাড়ছে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা, হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও কৃষিজমি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা জরুরি।
এই ভাঙনের বাস্তব চিত্র দেখা যায় ৮০ বছর বয়সী জহুরা খাতুনের জীবনে। পদ্মার ভাঙনে অন্তত চারবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন তিনি। একসময় যেখানে জমিজমা ছিল, এখন সেখানে নদীর পানি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নদীপাড়ে একটি ছোট ঘরে দিন কাটছে তার। অসহায় কণ্ঠে তিনি বলেন, পদ্মাই তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। বারবার ঘর ভাঙার পর এখন তিনি প্রায় নিঃস্ব, নির্ভর করতে হচ্ছে মানুষের সহানুভূতির ওপর।
একই গল্প কাঞ্চন বিশ্বাসেরও। পদ্মার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নদীর ধারে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। ভাঙন যে কীভাবে জীবন ও জীবিকা দুটোই ধ্বংস করে দেয়, তার বাস্তব উদাহরণ কাঞ্চনের জীবন।
নাসার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায় ১৯৮৮ সাল থেকে পদ্মা নদীর প্রস্থ, আকৃতি ও অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তীব্র ভাঙনের কারণে অনেক এলাকায় স্থায়ীভাবে বদলে গেছে ভূগোল ও মানচিত্র। বিশেষ করে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় ভাঙনের চিত্র ভয়াবহ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
পদ্মার বুকে জেগে ওঠা লেছরাগঞ্জ, সুতালড়ী ও আজিমনগর ইউনিয়নে গেল বর্ষায় পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ইউনিয়নগুলো চরাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙনের শিকার হচ্ছে। গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে এ এলাকা থেকে মানুষজন বারবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
নাসার গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে ৬৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমি। এই হারানো জমির আয়তন প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের সমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমে যাওয়াই এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নদী গবেষক অধ্যাপক তানজিনুল হক মোল্লা জানান, দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় হরিরামপুর অঞ্চলে নদীতীর সরে যাওয়ার হার তুলনামূলক বেশি। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে কিছু নতুন চর জেগে উঠছে, যেখানে মানুষ কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছে। তবে এসব চরও স্থায়ী নয়, যে কোনো সময় আবার ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পদ্মা কেবল একটি নদী নয়, এটি একটি জীবন্ত ভূপ্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এর প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। তাই ভাঙন রোধ ও নদী নিয়ন্ত্রণে খণ্ডকালীন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। না হলে পদ্মার ভাঙন আগামী দিনে আরও বড় মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
সুএ-জনকন্ঠ
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST