
তসলিম সরকার ময়মনসিংহঃ মাদক আজ আর শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত অপরাধ বা বদঅভ্যাসের বিষয় নয়; এটি সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ এক জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ মাদকের ছোবলে তাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলছে। অথচ সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আমরা অনেকেই জানি কারা এই বিষের ব্যবসা করছে, কারা যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে, তবুও নানা কারণে আমরা নীরব থাকি।
বাস্তবতা হলো, কোনো মাদক ব্যবসায়ী একা শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। তার শক্তির বড় উৎস সমাজের নীরবতা, উদাসীনতা এবং ভয়ের সংস্কৃতি। যখন ভালো মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলে না, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা কখনো নিরপেক্ষতা নয়; বরং তা পরোক্ষভাবে অপরাধকে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
আজ আমরা যদি ভাবি, “এটা আমার পরিবারের সমস্যা নয়”, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ মাদক কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, শ্রেণি বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ভয়াল থাবা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে গ্রাস করে। আজ যে আগুন অন্যের ঘরে জ্বলছে, আগামীকাল তা আমাদের নিজেদের ঘরেও পৌঁছাতে পারে।
আরও একটি বিষয় আমাদের স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে—অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী কিংবা সমাজবিরোধী ব্যক্তি যেই হোক, যে পরিচয়ের আড়ালেই থাকুক না কেন, তাকে অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে। অপরাধকে কখনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। কারণ অপরাধের পক্ষ নেওয়া মানেই সমাজের ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
সমাজে যখন কেউ সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন তাকে একা ফেলে দেওয়া উচিত নয়। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের পাশে যদি সমাজ না দাঁড়ায়, তাহলে অন্যায়ের শক্তি আরও সংগঠিত হয়। একজন মানুষের পক্ষে হয়তো পুরো সমাজ বদলে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আজ আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করার সময় এসেছে—আমাদের নীরবতা কি অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে না? আমরা কি শুধুই কোনো দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করব, নাকি তার আগেই সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলব? মনে রাখতে হবে, মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, একটি মায়ের হাসি কেড়ে নেয়, একজন বাবার আশা নিভিয়ে দেয় এবং একটি জাতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আসুন, আমরা ভয় নয়—সত্যকে বেছে নিই। নীরবতা নয়—প্রতিবাদকে শক্তিতে পরিণত করি। কারণ একটি সচেতন, সাহসী ও দায়িত্বশীল সমাজই পারে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST