
অভিযোগ বার্তা ডেস্কঃ
পুরান ঢাকার স্বাদ ও ঐতিহ্যের এক অন্যরকম গল্প জনসন রোডের এই ছোট্ট দোকানটি বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও,এর ভেতরের গল্প আর খাবারের সম্ভার যেকোনো নতুন ক্রেতাকেই মুগ্ধ করে। “ইউসুফ কনফেকশনারী” নামে পরিচিত হলেও,এটি “ইউসুফ বেকারি” নামেই বেশি পরিচিত এবং এর দীর্ঘ নয় দশকের পথচলা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রায় ৯ দশক আগে,১৯৩৯ সালে গোয়ালঘাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ তার নানা আবদুল ব্যাপারীর কেক-বিস্কুটের ব্যবসার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে ইসলামিয়া রেস্টুরেন্টের পাশে গড়ে তোলেন “ইউসুফ বেকারি” সে সময় রায়সাহেব বাজার,বংশাল,জনসন রোড ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা ও কোর্ট-কাছারির কাজে বহু মানুষের আনাগোনা ছিল।
ফলস্বরূপ,অল্প সময়েই ইউসুফ বেকারির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বেকারি পণ্যের পরিমাণও বাড়তে থাকে। ১৯৫৮ সালে বেকারিটির স্থান পরিবর্তন হয়ে চলে যায় ১৯/এ জনসন রোডে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেকারি পণ্য ছাড়াও নানা ধরনের নতুন খাবার সংযোজন হওয়ায় এর নাম পাল্টে রাখা হয় ইউসুফ কনফেকশনারী।
দোকানে ঢুকতেই চোখে পড়ে স্টিলের ফ্রেমে বাঁধানো এক বৃদ্ধের সাদাকালো ছবি – ইনিই বেকারির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইউসুফ। ১৯৯০ সালে তার মৃত্যুর পর,তার ১১ ছেলে ও ২ মেয়ে এই ব্যবসার হাল ধরেন।
বর্তমানে পুরান ঢাকা,ধানমন্ডি,গুলশান,রমনা,রামপুরা, ধোলাইখালসহ মোট ১২টি শাখা পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ ইউসুফের উত্তরসূরিরা।ইউসুফ বেকারির সব শাখার খাবারের স্বাদ ও মান একই রকম থাকার পেছনে রয়েছে এক বিশেষ কারণ। পুরান ঢাকার জজকোর্টের পেছনে অবস্থিত একটি কেন্দ্রীয় কারখানাতেই সব খাবার তৈরি হয়। এরপর জনসন রোডের মূল শাখা থেকেই ইউসুফ কনফেকশনারীর সব শাখায় এই খাবার সরবরাহ করা হয়।
ইউসুফ বেকারিতে হরেক রকম খাবারের সম্ভার রয়েছে। এখানে বিস্কুট,পাউরুটি,নিমকি,কেক চিপসসহ বিভিন্ন বেকারি আইটেম পাওয়া যায়,যার দাম বেশ হাতের নাগালে।
এছাড়া প্যাটিস,বার্গার,রোল ক্রিমবান,পরোটা,শিঙাড়া।এমন বাহারি ফাস্ট ফুডও তৈরি হয় এখানে অন্যান্য কনফেকশনারির মতো পানীয় ও প্যাকেটজাত খাবারও বিক্রি হয়।ইউসুফ বেকারির বিশেষ আকর্ষণ হলো তৎক্ষণাৎ তৈরি করা চানাচুর। এখানকার চানাচুরের সব উপকরণ আলাদা আলাদা বয়ামে রাখা হয়। এছাড়াও নিজেদের তৈরি টকডাল,মটরডাল,মোটা সেমাই,চিকন সেমাইমুগডাল বুন্দিয়া,চিড়া ভাজা,পাপড়,বেসনের গাঠিয়া ও বাদামসহ মোট ১১টি পদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় মসলা মিশিয়ে এই মুখরোচক চানাচুর তৈরি করা হয়। কেউ চাইলে নিজের পছন্দমতো উপকরণ কম-বেশি যোগ করেও চানাচুর বানিয়ে নিতে পারেন। এই চানাচুরের উপকরণ তৈরির জন্য আলাদা একটি কারখানা রয়েছে।
শবে বরাত ও রমজান মাসে ইউসুফ বেকারিতে কিছু বিশেষ খাবার যোগ হয়,যা অন্য সময় সচরাচর পাওয়া যায় না। শবে বরাতের সময় মাছ আকৃতির ফ্যান্সি রুটি এখানে বেশ জনপ্রিয়। মানুষ শখ করে দুই থেকে পাঁচ কেজি ওজনের এসব রুটি ফরমাশ দেন। এর সঙ্গে সুজি ও বুটের হালুয়াও থাকে। রমজান মাসে ইফতার আইটেম হিসেবে সুতি কাবাব,জালি কাবাব,হালিম,
কাটলেট,জিলাপি,নান এবং গ্রিলড চিকেনও পাওয়া যায়।
ইউসুফ বেকারিতে মুড়ি বিস্কুট,চিড়া বিস্কুট,মিষ্টি বিস্কুট, সলটেড,ড্রাই কেকসহ বিভিন্ন রকমের বিস্কুট পাওয়া যায়। এখানে কয়েক ধরনের প্যাটিস পাওয়া যায় “কাপ প্যাটিস” নামে এক ধরনের প্যাটিস।
এছাড়া কেকের মধ্যে চকলেট,ফ্রুট,ওভালটিন,প্লেইন কেক,জ্যাম রোলের বেশ কদর। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী টানা পরোটা ,চিকেন চিপস ও আলু চিপস। এখানকার ”ঘোড়ার ডিম” নামের ক্যান্ডির মতো এক খাবারও বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খাবারগুলো কেজিপ্রতি অর্ডার নেওয়া হয়,যেখানে পাইকারি ও খুচরা দামে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে।
আর এভাবেই দীর্ঘ ৯ দশক ইউসুফ কনফেকশনারী বা ইউসুফ বেকারি ঢাকাবাসীর মনে যে জায়গা দখল করে নিয়েছে,তা দোকানে ভিড় দেখলেই উপলব্ধি করা যায়।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST