
সম্পাদকীয় , সভার আয়োাজন করে নারীশিক্ষা নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর চেষ্টা করতেন পারেন। বর্তমান সময়ে সরকারের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংস্থা জেন্ডার নিয়ে কাজ করেন তাই একজন শিক্ষক চাইলে সরকারি বেসরকারি যেকোন কারিগরি সহযোগীতা পাবেন বলে বিশ^াস করি। এভাবে সক্রিয়ভাবে সবার মধ্যে নারীশিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরতে পারেন। শিক্ষক চাইলে স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় এ-ধরনের সমস্যা নিয়ে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন। নারী শিক্ষা কেবলমাত্র একটি উদাহরণ। জেন্ডার বিষয়ক যেকোনো সমস্যা সমাধানে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষকের কাজ করতে পারেন। আর শিক্ষক যখন বিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে সরাসরি জেন্ডার সমতায়নের অনুশীলন করবেন সেটা নিঃসন্দেহে জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষাক্রম ২০২২-এ জেন্ডার সংবেদনশীলতা: শিক্ষাক্রমকে বলা হয় যেকোন দেশের সামগ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা যেখানে ঐ দেশের সামগ্রিক শিক্ষার রূপকল্প কেমন হবে তার সামগ্রিক চিত্রায়ন থাকে। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত দেশপ্রেমিক, যুক্তিবাদী, উৎপাদনমুখী, অভিযোজনে সক্ষম সুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক” হিসেবে গড়ে তোলার রূপকল্প নিয়ে সদ্য বাস্তবায়িত হতে যাওয়া শিক্ষাক্রম ২০২২ নানান কারণে দেশের বিভিন্ন মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত। সকল আলোচনা সমালোচনাকে ছাপিয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাক্রমও জেন্ডার বিষয়ে সংবেদনশীলতার বিষয়টি লক্ষ্যণীয়। বর্তমান শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় জেন্ডার ও একীভূততার নায্যতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষাক্রমের রূপকল্প বর্তমানের সীমাবদ্ধতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির থেকে ন্যায্যতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অবস্থান্তরের জন্য জেন্ডার ও একীভূততা সংশ্লিষ্ট চিন্তার ক্ষেত্রে, ধারণায়ন, জেন্ডার ও একীভূততার লক্ষ্যদল নির্ধারণে, কর্মসূচি পরিকল্পনায়, সূচক নির্ধারিত ও সার্বিক ধারণায় একটি বড় রুপান্তরের প্রয়োাজন বলে মনে করে। সে সম্পর্কে শিক্ষাক্রম ২০২২’র রূপরেখায় বলা হয়েছে; “শিক্ষাক্রম উন্নয়ন থেকে শুরু করে, শিখন-সামগ্রী তৈরি, শিখন-শেখানো পদ্ধতি, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শ্রেণি পর্যায়ে বাস্তবায়নসহ সকল ধাপে তা জেন্ডার সংবেদনশীল ও একীভূত শিক্ষা সহায়ক করার জন্য একটি ব্যবহারিক চেকলিস্ট বা লেন্স তৈরি করা হবে যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের শিক্ষা ব্যবস্থার জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের কার্যক্রম কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন হলো সেটার জন্য একটি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে জেন্ডার বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান। বিদ্যালয় অনুশীলনেও যে ধরণের জেন্ডার বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় তা দূরীকরণে শিক্ষাক্রমেরও দায়বদ্ধতা থাকে। তাই দেশের শিক্ষাক্রমে আরো বেশী জেন্ডার সমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে জেন্ডার সমতায়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষাক্রমের নীতিমালার অনুশীলন মনিটরিং এবং মূল্যায়নের আওতায় আনা জরুরী।
ঙ. জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে স্থানীয় কমিউনিটি: জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বঢ় ভূমিকা হলো সমাজের। কারণ জেন্ডার বিষয়টি সমাজ সৃষ্ট। সমাজই নির্ধারণ করে দেয় সমাজে কার ভূমিকা কী হবে কিংবা কে কী করবে। তাই জেন্ডার সমতায়নে স্থানীয় সমাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রশাসন, সুশীল সমাজ, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গসহ সমাজের সকলের অংশগ্রহণ জরুরি। সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সমাজের সদস্যদের মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কমিউনিটির নেতৃত্ব এনজিওর মাধ্যমে জেন্ডার সমতায়নের আন্দোলন গড়ে তোলা হলে কমিউনিটির সদস্যদেরও ক্ষমতায়ন ঘটবে পাশাপাশি সবার মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীলতা গড়ে উঠবে। জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে জেন্ডার সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের মাধ্যম জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব।
প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস: জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। জেন্ডার বৈষম্য যেহেতু সামাজিক সমস্যা, তাই জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ কোন একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। স্থানীয় কমিউনিটি, শিক্ষাব্যবস্থা, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষক, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তকসহ সামগ্রিকভাবে সবার অংশগ্রহণ এখানে অত্যন্ত জরুরী। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জেন্ডার নির্বিশেষে সবাইকে নিজের অধিকার সর্ম্পকে সচেতন হতে হবে। সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে একসাথে মিলেমিশে থাকার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। আর এভাবেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন একীভূত সমাজিক ন্যায্যতার নারীবান্ধব সমাজ। অন্যদিকে জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো জেন্ডার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাগত অস্পষ্টতা এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে জেন্ডার ও জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে যুব সমাজকে সচেতন করতে হবে এবং তাদের মাধ্যমেই নেটওয়ার্ক তৈরী করতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রক্রিয়ার সঠিক অনুশীলন জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ করতে পারে,গড়ে তুলতে পারে বৈষম্যহীন সমাজ। নারীবান্ধব সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। [ লেখক: মো. নজরুল ইসলাম, লেখক ও উন্নয়নকর্মী]
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST