
ব্যুরো প্রধান,সিলেট
হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ৪ নং কাকাইলছেও ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের (প্রত্যায়ন অনুযায়ী ৪ নং ওয়ার্ড) অসহায় গৃহবধূ শোভা রানী সরকার দীর্ঘ ৮ বছরের দীর্ঘশ্বাস ও মানবেতর জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফিরে পেয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। মানবাধিকার সংস্থা HRCBM এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে গ্রাম আদালতের সালিশি রায়ের মাধ্যমে নিখোঁজ স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অংশ বুঝে পেয়েছেন তিনি।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, শোভা রানী সরকারের স্বামী সুমন সরকার বিগত ৮ বছর ধরে সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ রয়েছেন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা বা ভরণপোষণ না পেয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েন তিনি। এক নাবালক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই না থাকায় বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পৈতৃক পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ (গৃহপরিচারিকা) শুরু করেন শোভা রানী। এভাবে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন এই অসহায় নারী।
অবশেষে ন্যায়বিচারের আশায় শোভা রানী সরকার মানবাধিকার সংস্থা ‘HRCBM’ (Human Rights Congress for Bangladesh Minorities)-এর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে HRCBM-এর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। সংস্থাটির তৎপরতায় আজমিরীগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জনাব মোঃ মিসবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া এবং ৫ জন ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে ৪ নং কাকাইলছেও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সালিশে তোলা হয়।
মামলা ও শুনানির বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে গ্রাম আদালত রায় প্রদান করে যে, নিরুদ্দেশ সুমন সরকারের পৈতৃক বন্টনযোগ্য মোট ১২ শতক জায়গা (মৌজা- কাকাইলছেও, জে.এল নং- ৬১, খতিয়ান নং- ১১৯৭, দাগ নং- ২০৯৯, ২১১১) তিন ভাইয়ের মধ্যে সমান তিন ভাগে বিভক্ত হবে। সেই অনুযায়ী সুমন সরকারের প্রাপ্য এক-তৃতীয়াংশ জায়গা জীবনস্বত্বসহ তার স্ত্রী শোভা রানী সরকার এবং তার নাবালক পুত্র ইপন সরকার সৌরভকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ১০ জুন ২০২৬ তারিখ থেকে এই রায় কার্যকর করা হয় এবং গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে ইউপি চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে শোভা রানীকে অফিশিয়াল প্রত্যয়ন পত্র হস্তান্তর করা হয়।
দীর্ঘ ৮ বছরের লড়াই শেষে স্বামীর পৈতৃক ভিটায় সন্তানদের নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শোভা রানী সরকার। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি HRCBM-এর সিলেট বিভাগীয় অবজারভার মিহির রঞ্জন রায়-কে একটি বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন। স্মারক প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন HRCBM-এর সিলেট জেলা অবজারভার মিলা পালসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যবৃন্দ।
জায়গার দখল ও আইনি স্বীকৃতি পেলেও বর্তমানে ঘর তোলার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই এই অসচ্ছল পরিবারটির কাছে। এ বিষয়ে শোভা রানী সরকার অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “৮ বছর পর স্বামীর ভিটা ফিরে পেয়ে আমি ও আমার সন্তানেরা অনেক খুশি। HRCBM ও চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এখন কিছু টাকা জমিয়ে বা কারও সহযোগিতা পেলে এই জায়গায় একটি ঘর তুলে সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করতে পারব।”
এলাকাবাসী মানবাধিকার সংস্থা HRCBM এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এই দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, যার ফলে একটি অসহায় পরিবার পথ থেকে আবার নিজের ভিটেমাটি ফিরে পেল।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST