
এস এম ফিরোজ আহাম্মেদ ঢাকা: আমকে বলা হয় ফলের রাজা। স্বাদ, ঘ্রাণ আর পুষ্টিগুণে গ্রীষ্মের এই ফলটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। দেশের বাজারে ল্যাংড়া, গোপালভোগ বা ফজলি আমের ভিড়ে একটি নাম সবার চেয়ে আলাদা—‘আম্রপালি’। ছোট আকার, আঁশহীন গাঢ় কমলা শাঁস, তীব্র মিষ্টি স্বাদ আর দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ গুণ—সব মিলিয়ে আম্রপালি এখন আমপ্রেমীদের শীর্ষ পছন্দ।
তবে কেবল স্বাদেই নয়, এই আমের নামের পেছনে লুকিয়ে আছে আড়াই হাজার বছর আগের ইতিহাস, রূপ আর রোমাঞ্চের এক অবিশ্বাস্য গল্প। প্রাচীন ভারতের এক রূপসী নর্তকীর নাম থেকেই মূলত নামকরণ করা হয়েছে এই রাজকীয় আমের।
আমতলার কুড়িয়ে পাওয়া শিশু থেকে ‘নগরবধূ’ ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতের লিচ্ছবি রাজ্যের রাজধানী বৈশালী ছিল এক সমৃদ্ধ নগর। সেই নগরের এক রাজকীয় আম্রকাননে (আমবাগান) গাছের নিচে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তানকে কুড়িয়ে পান বাগানের রক্ষক। আমগাছের নিচে পাওয়া যাওয়ায় পরম যত্নে বড় হতে থাকা সেই শিশুর নাম রাখা হয় ‘আম্বপালি’ বা ‘আম্রপালি’।
ধীরে ধীরে বড় হয়ে আম্রপালি হয়ে ওঠেন তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে রূপসী নারী ও অনন্য এক নর্তকী। তাঁর নৃত্যশৈলী আর সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে। রূপের কারণে রাজ্যে যেন কোনো যুদ্ধ না বাধে, তাই বৈশালীর নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সরকারিভাবে ‘নগরবধূ’ বা প্রধান রাজনর্তকী ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মগধের সম্রাট বিম্বিসারের মন জয় করেন এবং জীবনের শেষভাগে এসে গৌতম বুদ্ধের সান্নিধ্যে এসে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।
ইতিহাসের সেই রূপসী আম্রপালিকে অমর করে রাখতে ১৯৭৮ সালে ভারতের কৃষি গবেষকরা এক অভিনব উদ্যোগ নেন। নতুন দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ এর প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. পি. কে. মজুমদার এবং তাঁর দল দুটি ভিন্ন জাতের আমের সংকরায়ণ ঘটান।
স্বাদের জন্য বিখ্যাত ‘দশেহরি’ (মা-গাছ) এবং নিয়মিত ফলন ও দীর্ঘ সময় ভালো থাকার গুণসম্পন্ন ‘নীলাম’ (বাবা-গাছ) আমের মিলনে জন্ম নেয় এক নতুন জাত। ঐতিহাসিক নর্তকীর সৌন্দর্যের সঙ্গে মিল রেখে এই অতুলনীয় মিষ্টি আমের নাম রাখা হয় ‘আম্রপালি’।
চাষিদের প্রথম পছন্দ কেন আম্রপালি? আম্রপালি মূলত একটি বামন বা ছোট আকৃতির গাছ। সাধারণ আমগাছ অনেক বড় হলেও আম্রপালি গাছ আকারে বেশ ছোট ও ঝোপালো হয়। ফলে প্রতি হেক্টরে সাধারণ আমের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি গাছ লাগানো সম্ভব। আধুনিক ‘উচ্চ ঘনত্বের বাগান’ পদ্ধতির জন্য এটি চাষিদের প্রথম পছন্দ। গাছ লাগানোর অল্প দিনের মধ্যেই এতে প্রচুর ফলন আসে।
চেনার উপায় ও বাজারের সময় -আম্রপালি আম সাধারণত ছোট থেকে মাঝারি আকারের এবং কিছুটা ডিম্বাকৃতির হয়। এর খোসা বেশ মসৃণ এবং পাকার পর সবুজ-হলুদাভ রঙ ধারণ করে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এতে কোনো আঁশ থাকে না এবং কাটলে ভেতরের অংশটি গাঢ় কমলা রঙের দেখায়। সাধারণত প্রতি বছর জুনের শেষভাগ থেকে বাজারে আসল ও মানসম্মত পাকা আম্রপালি পাওয়া শুরু হয়।
প্রাচীন ভারতের রূপের জাদু আর আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে তৈরি এই আম্রপালি আজ শুধু একটি ফলের নাম নয়, বরং গ্রীষ্মের এক পরম তৃপ্তির নাম।
লেখক- এস এম ফিরোজ আহাম্মেদ,সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক অভিযোগ বার্তা
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST