সাইপ্রাসে দুঃস্বপ্নের দিন-রাত বাংলাদেশি ছাএদের - দৈনিক অভিযোগ বার্তা    
নিউজ এডিটর
২৩ মার্চ ২০২৬, ৯:৫৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সাইপ্রাসে দুঃস্বপ্নের দিন-রাত বাংলাদেশি ছাএদের

অনলাইন ডেস্কঃ

“কষ্টে কান্না চলে আসে; টাকা শেষ হয়ে যায়, খাওয়ার টাকা থাকে না। ২-৩ দিন না খেয়েও থাকতে হয় টাকা বাঁচানোর জন্য।”

উচ্চশিক্ষার জন্য সাইপ্রাসে আসা শেখ আবদুল আহাদের কণ্ঠে ঝরছিল দুর্দশার কথা। কাজের সুযোগসহ পড়াশোনার উদ্দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশটিতে পাড়ি দিয়ে বিপদে পড়েছে শত শত বাংলাদেশি।আহাদ বলছিলেন, “৮ মাসে কাজ খুঁজতে খুঁজতে পাঁয়ের জুতা ক্ষয় হয়ে গেছে, তবুও কাজ পেলাম না।”

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, বর্তমানে সাইপ্রাসে আসতে একজন শিক্ষার্থীকে ১০-১২ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে। ঋণের টাকায় সাইপ্রাসে গিয়ে এক বছরের মধ্যে তা পরিশোধের ভাবনা ছিল অনেকেরই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, খাওয়া-পরার টাকাই জোটানো কঠিন ঠেকছে। অনেকের মা-বাবা ছেলের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে ভিটেমাটি পর্যন্ত বেচতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাহিদ আহমেদ নামের একজন বললেন, “সাইপ্রাস আসছি ৫ মাস হয়েছে, এখনো কাজ পাইনি। দেশের ঋণের টাকার দুশ্চিন্তায় একদিনও ঘুমাতে পারিনি।”অভিজ্ঞ বাংলাদেশি প্রবাসীরা বলছেন, এখানে কয়েক বছর পরপর বাংলাদেশিদের জন্য ‘স্টুডেন্ট ভিসা’ বন্ধ রাখা হয়। এরপর আবারও সেই ভিসা চালু করা হয়।

“এটা হল সাইপ্রাস সরকারের একটা কৌশল। যখনই তাদের অর্থের প্রয়োজন হয়, তখনই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান থেকে স্টুডেন্ট এনে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। আর তাদের সেই ট্র‍্যাপে পাঁ দিয়ে পথে বসে হাজার হাজার বাংলাদেশি স্টুডেন্ট,” বলছিলেন দীর্ঘদিন ধরে সাইপ্রাসে থাকা এক বাংলাদেশি।

বাংলাদেশিদের কয়েকজন জানান, ভিসা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন এজেন্সি ও সাইপ্রাসে থাকা বাংলাদেশি দালালচক্র নানা প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে শত শত শিক্ষার্থী এনে থাকে। সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী আনা দালালদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও আছেন, যারা সাইপ্রাস থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী হয়েছেন।

কয়েকজন প্রবাসী বলেন, সাইপ্রাস আসার জন্য অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশনের পাশাপাশি ন্যূনতম আইএলটিএস স্কোরের দরকার পড়ে। দালালরা ভুয়া সনদ বানিয়ে কলেজগুলোর শর্ত পূরণ করে। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জেনেও না জানার ভান করে। কারণ তাদের দরকার মোটা অংকের টিউশন ফি।

নাহিদ নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, দালাল তাকে ১২০০ ইউরো বেতনের চাকরি দেয়ার কথা বলে সাইপ্রাস আনার পর এক বছর হয়ে গেলেও কাজ পাননি।তবে একরাম নামের একজন বলেন, “সাইপ্রাস আসছি এক বছর হলো। তার ভেতর দুইমাস গাছ কাটার কাজ করছি, একমাস বাগান পরিষ্কারের কাজ করছি, আর দুইমাস বিভিন্ন কাজ করে এক বছরে ৩০০০ ইউরো ইনকাম করেছি।”

সাইপ্রাসে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন, এমন কয়েকজন বাংলাদেশির ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে এখানে যারা আসে, তাদের অনেকেই জানে না তারা কোন সাইপ্রাসে যাচ্ছে। দেশটি যে গ্রিক সাইপাস (রিপাবলিক অব সাইপ্রাস) এবং তুর্কি সাইপ্রাসে (নর্দার্ন সাইপ্রাস) বিভক্ত তা আসার পর জানতে পারেন অনেকেই। গ্রিক সাইপ্রাসই ‘সাইপ্রাস’ নামে পরিচিত; তবে দুই দেশের ভাষা, কাজের মান, শিক্ষাব্যবস্থা ও মুদ্রার মান ভিন্ন।

সাইপ্রাসে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী মোজাম্মেল হোসেন তারেক বলেন, “বাংলাদেশ থেকে সাইপ্রাসে স্টুডেন্ট আসার আগে যেন অনলাইন বা বিভিন্ন মাধ্যমে আগে খোঁজ নিয়ে তারপর আসে।”সাইপ্রাস কৃষি নির্ভর বা শিল্প নির্ভরশীল না হওয়ায় দেশটিতে কাজ পাওয়া বেশ কঠিন। পর্যটক নির্ভর হওয়ায় দেশটিতে সারা বছর কাজ থাকে না। তবে যারা হোটেলে শেফের কাজ বা বিভিন্ন মেকানিক্যাল কাজ পারেন, তাদের জন্য মোটামুটি কাজ পাওয়া অনেক সহজ।বাংলাদেশ থেকে যারা আসে, সাধারণত তাদের এমন দক্ষতা থাকে না। ফলে কাজ খুঁজতে খুঁজতে মাসের পর মাস চলে গেলেও তা আর মেলে না। কারণ কাজ না জানা লোককে সাইপ্রাসে কেউ কাজে নেয় না।

কাজ না পাওয়ার আরেক কারণ হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন ক্লাস করা বাধ্যতামুলক। ক্লাস না করলে তারা ইমিগ্রেশনে রিপোর্ট দেয়। আবার ঠিকমতো ক্লাস করতে গেলে কাজে যাওয়া সম্ভব হয় না। তার মধ্যে আবার পুলিশের কাছে ধরা খাওয়ার ঝুঁকি তো রয়েছেই।

অভিজ্ঞ বাংলাদেশিরা বলছেন, কাজ খুঁজতে খুঁজতে ছয় মাস, একবছর চলে যায়। এরপর ভিসা রিনিউ করার সময় চলে আসে, যার জন্য গুনতে হয় ২৫০০-৩০০০ ইউরো। কেউ কেউ দেশ থেকে টাকা আনতে পারলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এক-দুই বছর পরে অবৈধ হয়ে যান।সাইপ্রাসে এসে ছাত্রীদেরও বেশ ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়রাই রেস্তোরাঁ, হোটেল, সুপারশপের কাজ করায় বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে আসা ছাত্রীদের কাজ পাওয়া খুবই কঠিন। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই বাসার কাজ করে, কেউ কেউ সুপার মার্কেটে ক্লিনিংয়ের কাজ করে, আবার কেউ কেউ অনলাইনে খাবারের ব্যবসা করে।

অভিজ্ঞ প্রবাসী নাহিদা আক্তার বলেন, “বাংলাদেশ থেকে যেসব মেয়েরা আসবে, তারা যেন সেলাই কাজ বা রেস্টুরেন্টের শেফের কাজ শিখে আসে; তাহলে কাজ পাওয়া সহজ হবে।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পর্তুগালের বড় জয় ও রোনালদোর বিশ্বকাপে ইতিহাস

ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রশাসনের আকস্মিক পরিদর্শন, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিতের নির্দেশ

গোয়াইনঘাটের হাজীপুরে সনাতন পদ্ধতির আড়ালে অবৈধ ড্রেজিং: হুমকির মুখে রাস্তা ও ঘরবাড়ি

পাহাড়ি ঢলে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র সাময়িক বন্ধ ঘোষণা

নিখোঁজের ছয় দিন পর স্কুলছাত্রীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, প্রধান শিক্ষকসহ আটক – ৭

আর্জেন্টিনা প্রথম দল হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি

আজ দৈনিক অভিযোগ বার্তা’র সম্পাদক এস এম ফিরোজ আহামেদ’র জন্মদিন 

পাহাড়পুরে বিদেশি পর্যটককে হেনস্তার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ‘হিরো নানা’ গ্রেফতার

হালদার সাত কিলোমিটার খনন

সিলেটের ডিসি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বদলি

১০

ময়মনসিংহে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

১১

ঠাকুরগাঁওয়ে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন

১২

যুক্তরাজ্যে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর নামে মামলা

১৩

গোয়াইনঘাটে মানবিক ওসির বিরুদ্ধে নোংরা রাজনীতি

১৪

রাজবাড়ীতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত।

১৫

বালিয়াডাঙ্গী থানা পুলিশের অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ ৪ জন আটক,গাঁজা ও ইয়াবাসহ জব্দ

১৬

জৈন্তাপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে ১ জনের কারাদণ্ড, উপজেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

১৭

জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে চসিক মেয়র

১৮

পাটুরিয়াঘাট এলাকা থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী আটক

১৯

বগুড়ায় ৪ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএমএসএস

২০

Design & Developed by BD IT HOST