
মো গোলাম কিবরিয়া , নড়াইলঃ
নড়াইল জেলায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আটটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব হত্যাকাণ্ডে প্রাধান্য পেয়েছে পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক আধিপত্য এবং পাশবিকতা, যা স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। প্রশাসন প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলেও থেমে নেই হত্যা।
১. সৈয়দ টোকন আলী হত্যা (৭ মে ২০২৫)
লোহাগড়া উপজেলার করফা গ্রামে পারিবারিক বিরোধের কারণে ৬০ বছর বয়সী সৈয়দ টোকন আলী তার চাচাতো ভাই ও ভাতিজাদের হাতে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় তার দুই ছেলে এবং পুত্রবধূ আহত হন। এটি পারিবারিক অশান্তির এক চরম পর্যায়ে পরিণত হয়, যেখানে অতিরিক্ত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
২. সালমান খন্দকার হত্যা (৯ মে ২০২৫)
নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের কাউলিডাঙ্গা বিল থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী সালমান খন্দকার (২৬) এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা শত্রুতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
৩. শিশু শাহাদাত হত্যা (১২ মার্চ ২০২৫)
চরশামুকখোলা গ্রামে মাত্র চার বছরের শিশু শাহাদাতকে তার সৎ দাদি হত্যা করে মাটি চাপা দেওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন। এ ঘটনা পরিবারের অভ্যন্তরীণ শত্রুতা এবং মানবিক অমানবিকতা হিসেবে উঠে এসেছে, যা পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে। শিশু হত্যার এই ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
৪. শ্রমিক নেতা আব্দুল্লাহ-আল-মামুন হত্যা (৩০ মার্চ ২০২৫)
লোহাগড়া পৌর শহরের লক্ষ্মীপাশা চৌরাস্তা এলাকায় কাঁচামাল কেনা নিয়ে বিরোধের জেরে শ্রমিক নেতা আব্দুল্লাহ-আল-মামুনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুতে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে।
৫. মোশারফ হোসেন মুসা হত্যা (১২ এপ্রিল ২০২৫)
নড়াইল সদর উপজেলার নতুন বাস টার্মিনাল এলাকায় ছুরিকাঘাতে মোশারফ হোসেন মুসা (৪৫) নিহত হন। দুর্বৃত্তরা সকাল বেলায় এ হামলা চালায়। মোশারফ হোসেন মুসা স্থানীয় সমাজে পরিচিত ছিলেন এবং তার হত্যাকাণ্ড সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। পুলিশ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।
৬. শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা (৩০ ডিসেম্বর ২০২৪)
যদিও এই ঘটনা ২০২৪ সালের শেষ দিকে ঘটেছে, তবে তার প্রভাব ২০২৫ সালে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হৃদয় বৈরাগী নামের এক ব্যক্তি তার চার বছর বয়সী আত্মীয়াকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। এ ধরনের পাশবিক ঘটনা পুরো সমাজে তীব্র নিন্দার সৃষ্টি করেছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে।
৭. তালেব শেখ হত্যা (৩০ মার্চ ২০২৫)
কালিয়া উপজেলার জামরিলডাঙ্গা গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তালেব শেখ (৬৫) নিহত হন। এ সংঘর্ষে আরও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সামাজিক আধিপত্যের লড়াইয়ে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে।
৮. ফরিদ মোল্যা হত্যা (১১ এপ্রিল ২০২৫)
কালিয়া উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে ফরিদ মোল্যা (৫৭) নিহত হন। এই সংঘর্ষে আরও ৩০ জন আহত হন, যার মধ্যে বেশ কিছু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
নড়াইল জেলা: প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এধরণের একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। তবে, স্থানীয় জনগণের মতে, এমন সহিংসতা রোধে শুধু প্রশাসনের পদক্ষেপ নয়, স্থানীয় সমাজের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে যে প্রবণতাগুলোর কথা উঠে এসেছে, তা স্থানীয় শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীঘ্রই যদি প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়, তবে আরো বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST