
গাজীপুর প্রতিনিধিঃ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন হারুনুর রশিদ। পরিচিতি পেয়েছিলেন ডিবি হারুন নামে। তিনি গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) থাকাকালে পুরো জেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তার ভয়ে তটস্থ থাকতো বিরোধী দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা। এমনকি সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। যে ব্যবসায়ী কিংবা রাজনীতিবিদকে টার্গেট করতেন তাকেই শিকারে পরিণত করতেন তিনি। তুলে এনে মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করতেন টাকা। তার আমলে জেলার সব উপজেলায় অবৈধ মাদক কারবার ছিল ওপেন সিক্রেট। এসব অবৈধ কারবারিরা প্রতিদিনই তাকে মাসোহারা পাঠাতেন। হারুনের নিয়োজিত ক্যাশিয়ার বস্তাভর্তি করে রাতে নিয়ে যেতেন টাকা। আর এসব ক্যাশিয়ারদের পাহারায় থাকতেন থানার ওসিরা। গাজীপুরের এসপি থাকাকালে নামে-বেনামে কিনেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ। গড়েছেন রিসোর্ট।
তেমনই একটি রিসোর্টের সন্ধান মিলেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে। উপজেলা সদরের ৪নং ওয়ার্ডে রিসোর্টটির অবস্থান। প্রায় ১৫ বিঘা জমির উপর করেছেন রিসোর্টটি। নাম দিয়েছেন ‘সবুজ পাতা’। উদ্বোধনের পর থেকে গত ৫ই আগস্টের আগ পর্যন্ত রিসোর্টটি জমজমাট থাকতো অতিথিতে। প্রতিদিন রিসোর্টের সবগুলো রুম বুকিং থাকতো। আসতেন তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীলরাও। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর বদলে যায় চিত্র। ওইদিন শতাধিক ছাত্র-জনতা হামলা চালায় ওই রিসোর্টে। তালা দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান নিরাপত্তা রক্ষীরা। পরে তালা ভেঙে বিভিন্ন কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে সাধারণ মানুষ। এসময় লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। কিছুদিন পর একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা রিসোর্টটির দেখভালের দায়িত্ব নেন। শিপন নামের এক ব্যবসায়ীর নামে লিজ নিয়ে তারা রিসোর্টটি চালাচ্ছেন। সরজমিন রিসোর্টটিতে ও আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবি হারুন জমি কেনার সময় তার ভাগ্নি সালমা নামে নরসিংদীর এক নারীর নামে কিনেন। ৫ তারিখে ছাত্র- জনতা যখন হামলা চালায় তখন এলাকার মানুষ বলেন একটি প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে লাভ কী? ৫ তারিখের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জাফর নামে এক ব্যক্তি ও টাঙ্গাইলের শিপন নামে এক ব্যবসায়ী রিসোর্টটি লিজ নেয়ার কথা বলেন। তখন তারা স্থানীয় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা জিয়া, মাসুদ, সামাদকে দায়িত্ব দেন দেখভালের জন্য। তারা সবাই দলটির অঙ্গ ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তদারকির দায়িত্বে থাকা জিয়া বলেন, শুনেছি ডিবি হারুনের নাম দিয়ে রিসোর্টটি চালাতেন দুজন মহিলা। ৫ তারিখের পর আমার রিসোর্টটি দেখভাল করছি যাতে দলের নাম ভাঙিয়ে হামলা ও লুটপাট করতে না পারে। তবে এখন যিনি মালিক তিনি রিসোর্টের মূল মালিকের কাছ থেকে লিজ নিয়েছেন। আমাদের শুধু দায়িত্ব দিয়েছেন তদারকি করার জন্য। এ ছাড়া দলীয় কোনো প্রোগ্রাম হলে রিসোর্টটি ব্যবহার করতে পারি।
লিজ মালিক শিপন বলেন, আমিও লোক মারফত শুনেছি- ডিবি হারুন সাহেবের রিসোর্ট নাকি এটা। তবে আমি লিজ নিয়েছি নরসিংদীর জহির নামে একজনের কাছ থেকে। আমি যতটুকু জানি জহির সহ আরও তিনজন নারী এই রিসোর্টের মালিক। ডিবি হারুনকে আমি কখনো দেখিনি। আর জমি দখলের বিষয়ে যারা রিসোর্টের মূল মালিক তারা বলতে পারবেন। এ বিষয়ে জানতে জহিরকে ফোন দিলে তার মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
রিসোর্টে রয়েছে, দৃষ্টিনন্দন সুইমিংপুল, খেলার মাঠ, লেক, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, রাত্রিযাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের রুম, ভিলা ও কটেজ।
কটেজের প্রতি রাতের ভাড়া ৪ হাজার টাকা। ডিলাক্স রুম রয়েছে ১২টা, এক রাতের জন্য প্রতিটির ভাড়া ৫ হাজার টাকা। লাক্সারি ভিলা রয়েছে। সেটিতে রাত্রি যাপনের ভাড়া ৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া সুইমিংপুলে নামতে হলে প্রতি জনকে গুনতে হবে ৫০০ টাকা। রিসোর্টের এন্ট্রি ফ্রি ২০০ টাকা। এ ছাড়া ১৩ জন কর্মচারী রিসোর্টটিতে কাজ করেন। রিসোর্ট থেকে বের হতেই দেখা গেল- কয়েকজন যুবক বসে আছেন। সাব্বির নামে একজন বলেন, ডিবি হারুন এটি চালাতেন তখন ভয়ে এই রিসোর্টের ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষতো না। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠাতেন হারুন। স্থানীয় কেউ কিছু বলার সাহস পেতো না।
সুএঃ মানবজমিন
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST