
বিশেষ প্রতিনিধি, গোয়াইনঘাট (সিলেট):
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় রূপ বদলে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলকারী সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খোলস পাল্টে বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে তারা পুরো উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব বজায় রেখেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নাম ভাঙিয়ে এবং প্রশাসনকে ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমি দখল ও সীমান্ত চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে এই চক্রটি।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে গোয়াইনঘাটে একাধিক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় রাজত্ব কায়েম করত কালা সামসু, জামাই সুমন, আলীম উদ্দিন, সুবাস, মুজিব, রাসেল ও সারোয়ার বাহিনী। আর তাদের মূল ক্যাডার হিসেবে মাঠে কাজ করে কামরুল ও খায়রুল গং এই প্রতিবেদক কামরুল ইসলামের ব্যক্তিগত (
০১৭২১২২**১৪) মোবাইলে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওার জন্য কল দিলে সে রিসিভ করে নাই । ওই সময়েও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভূমি দখল, চা-বাগানের জায়গা আত্মসাৎ, পাথর-বালু উত্তোলন এবং সীমান্তে অবৈধ মাদক, অস্ত্র, গরু ও কসমেটিকস চোরাচালানের প্রধান কারিগর ছিল তারা।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই সিন্ডিকেট দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে মেসার্স কামরুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের নামে গোয়াইনঘাটের বালুমহাল ইজারা নিয়ে নতুন করে চাঁদাবাজি ও তাণ্ডব শুরু করে তারা।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ইজারা সীমানার তোয়াক্কা না করে হাজীপুর, আহারকান্দি, উত্তর প্রতাপপুর এবং লোনি কইনা জঙ্গল এলাকায় রাতের আঁধারে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে কোটি কোটি টাকার বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে। অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ চা-বাগানের বিস্তর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
চা-বাগানের অসহায় শ্রমিকরা এই অপকর্মের প্রতিবাদ করলে তাদের বিভিন্ন হত্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখা হচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলা বা চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় স্থানীয়দের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটছে।
চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সম্প্রতি ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমেদের বাড়িতে কামরুল, খায়রুল ও জুবায়ের সিন্ডিকেট অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ১৩ জন গুরুতর আহত হন এবং নৃশংসভাবে ২ জনের হাতের আঙুল কেটে ফেলা হয়। এ ঘটনায় গোয়াইনঘাট থানায় মামলা করা হলেও তৎকালীন ওসি বিপুল পরিমাণ অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে কৌশলে উভয় পক্ষকে মেটানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাজীপুর সিরিঘাটের নিচে সিলেটের প্রবাসী লন্ডনী কামালের প্রায় ৭ একর জায়গা ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে ক্ষমতার প্রভাবে দখল করে নেয় চক্রটি। পরবর্তীতে সেই জায়গা থেকে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার সুযোগ দিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা চাঁদা তোলে সিন্ডিকেটটি। ভুক্তভোগী লন্ডনী কামাল সিলেট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করে আদালতের রায় নিজের পক্ষে পান।
ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ নামে এক বৈধ ইজারাদারকে জিম্মি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো টাকা-পয়সা ছাড়াই জোরপূর্বক অংশীদারিত্ব হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, প্রতিদিন এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার চাঁদা আদায় করছে। অনৈতিক এই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও কিছু অসাধু মাধ্যমকে বিপুল পরিমাণ মাসোহারা দিয়ে নীরব রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তথ্যমতে, প্রশাসন বাবদ প্রতি সপ্তাহে ২০ লাখ টাকা এবং কতিপয় সাংবাদিকদের ম্যানেজ করতে সপ্তাহে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করা হয়। এমনকি প্রশাসনিক লাইন বজায় রাখতে গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের এক নেতাকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
একসময় সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হলেও রাজনৈতিক এক অভিভাবকের হস্তক্ষেপে তা ভেস্তে যায় বলে গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমানে বাংলাবাজারের রিয়াজ মেম্বার ও তার লোকজনের ওপর হামলাসহ পুরো গোয়াইনঘাটের বুঙা সিন্ডিকেট ও অবৈধ সীমান্ত কারবার এই চক্রের ইশারাতেই পরিচালিত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, আরিফুল হক চৌধুরীসহ শীর্ষ নেতৃত্বের নাম ভাঙানো এই চিহ্নিত বালু খেকো ও সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুত নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST