
শাল্লা উপজেলা প্রতিনিধিঃ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাগজপত্রে পিআইসিগনকে শতভাগ বিল ছাড় দেওয়ার তথ্য দেখানো হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা শতভাগ কাজ করার পরেও তাদেরকে বিল দেওয়া হয়নি। সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৪টি প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত ১৬ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা উত্তোলন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পিআইও’র একাউন্টে রাখা হয়েছে যা সম্পূর্ণ পরিপত্রের পরিপন্থী। দুর্যোগ ত্রাণ ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন এসব চিত্র উঠে এসেছে।
এর আগে শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ নুরুন্নবী সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে গত ১২/০৮/২৫ তারিখে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (আইন সেল) উপপরিচালক মোঃ আশ্রাফুল হক সরেজমিনে অভিযোগটি তদন্ত করেন। গত তিন সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দেন তিনি। তদন্ত রিপোর্টে পিআইও নুরুন্নবী সরকারের পাশাপাশি শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাসও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন আরো উল্লেখ করা হয়, উক্ত অর্থবছর পেরিয়ে গেলেও পরিপত্র পরিপন্থীভাবে ১৪টি প্রকল্পের ২য় কিস্তির অর্থ ছাড় করেননি। অথচ অর্থ বছর শেষে ২০/০৭/২৫ ইং তারিখে ইউএনও ও পিআইও’র যৌথ স্বাক্ষরে বাৎসরিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সকল প্রকল্পের সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানো হয়েছে। নিয়মানুযায়ী প্রকল্প সমূহের কাজ যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে অর্থ বছর শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সম্পাদিত কাজ ও অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানোর কোন সুযোগ নেই। কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পের সম্পাদিত কাজ ও উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ শতভাগ দেখানো হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পের টাকা উত্তোলন পূর্বক প্রকল্প সভাপতিদের ২য় কিস্তির অর্ধেক টাকা আটকে রেখেছেন যেখানে পরিপত্র মোতাবেক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত অন্যকারো প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের কোন সুযোগ নেই। অথচ ১৪ টি প্রকল্পের ২য় কিস্তির টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার একাউন্টে। ওই ১৪টি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৩৩ লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা। প্রকল্পের সভাপতিরা ১ম কিস্তিতে অর্ধেক টাকা পেলেও প্রকল্পের সভাপতি ব্যতিত ২য় কিস্তির টাকাগুলো কর্মকর্তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে যা সম্পূর্ণ নীতিমালার পরিপন্থী।
স্থানীয়রা বলছেন কর্মকর্তাদের অবস্থা যদি এরকম হয় তাহলে জনপ্রতিনিধিরা প্রকল্প দিয়ে এলাকার উন্নয়ন করবে কিভাবে? প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন প্রকল্পের কাজ শতভাগ করার পরেও আমাদেরকে বিল দেননি ইউএনও ও পিআইও। প্রকল্প সভাপতিদের স্বাক্ষর ছাড়াই এসব প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের পায়তারা চালাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পিআইও।
বিল আটকে রেখে দেওয়া একটি প্রকল্পের সভাপতি ৪নং শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো: আব্দুল হাই। তিনি বলেন,শতভাগ কাজ করেছি তারপরও আমরা বিল পাইনি। এখন ওই টাকাগুলো কর্মকর্তারা আত্মসাতের পায়তারা চালাচ্ছে। আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো: নুরুল হক বলেন, যেখানে আমাদেরকে বিল দেওয়ার কথা, সেখানে ওই টাকা কর্মকর্তাদের একাউন্টে কিভাবে রাখা হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। তিনি বলেন এটা স্পষ্ট যে টাকাগুলো কর্মকর্তারা আত্মসাতের পায়তারা চালাচ্ছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন শাল্লা শাখার আহ্বায়ক মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, সরকারের দেওয়া বরাদ্দগুলো বাস্তবায়নের সঙ্গে হাওর,নদী ও প্রকৃতি জড়িত। তিনি বলেন, কাজ করার পরেও যখন কর্মকর্তারা বিল ছাড় করেননি অবশ্যই সেখানে দুর্নীতি করা হয়েছে। তিনি বলেন তদন্ত প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট।
আজকে দুপুর দেড়টায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে পিআইও নুরুন্নবী সরকারকে তার অফিসে পাওয়া যায় নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি ছুটি ছাড়াই সপ্তাহ খানেকের অধিক সময় তার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছে। তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে পিআইও নুরুন্নবী সরকার এই প্রতিবেদকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন ধুয়ে ধুয়ে পানি খাও।
পিআইও নুরুন্নবী সরকার ছুটিতে রয়েছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কর্মকর্তা মোঃ হাসিবুল হাসান (অ:দা) বলেন, পিআইও দুদিনের ছুটি নিয়েছে। তিনি অধিদপ্তর পিআইও’র দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছেন এখন মন্ত্রনালয় এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, আমাদেরকে অনেক কিছুই মেইনটেইন করতে হয়। নিয়মবহির্ভূত ভাবে টাকাগুলো উত্তোলন করা হয়েছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকাগুলো রাখা না হলেতো সরকারি কোষাগারে চলে যাবে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা দুর্যোগ ত্রাণ ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (আইন) মোঃ আশ্রাফুল হক বলেন, তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখন এবিষয়ে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন মন্ত্রনালয়।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST