প্রকৌশলী ‘নিঃস্ব’, স্ত্রীর তিন ফ্ল্যাট, দুই ছেলে কোটিপতি! - দৈনিক অভিযোগ বার্তা    
নিউজ এডিটর
১৩ মার্চ ২০২৬, ৪:৪৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

প্রকৌশলী ‘নিঃস্ব’, স্ত্রীর তিন ফ্ল্যাট, দুই ছেলে কোটিপতি!

পিরোজপুর প্রতিনিধিঃ

হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যাংক হিসাব প্রায় শূন্য। কাগজে-কলমে তিনি প্রায় নিঃস্ব। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবেও তাঁর নামে বড় কোনো সম্পদের খোঁজ মেলেনি।

অথচ তাঁর পরিবারে যেন টাকার ঝর্ণাধারা। গৃহিণী স্ত্রীর নামে একের পর এক ফ্ল্যাট, রয়েছে বাড়ি। এই ঝর্ণাধারা থেকে কলেজপড়ুয়া দুই ছেলে বঞ্চিত হননি। তারাও কোটিপতি। তাদের ব্যাংক হিসাবেও কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে।

এমন বিস্ময়কর হিসাব সামনে এসেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুরের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার। তার পরিবারকে ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে টাকার ঝর্ণাধারা খোঁজ মিলেছে।

পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন মহারাজের পরিবারের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনেক দিন ধরেই আলোচনায়। এলজিইডি পিরোজপুরের বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহারাজ পরিবার এই অর্থ আত্মসাত করেছিল।

এই দুর্নীতির নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার। অনুসন্ধান শেষে মামলা দায়েরের পর এমনটাই বলছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মহারাজ পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আটটি মামলারও আসামি তিনি।

তবে অনুসন্ধানে নেমে দুদকের কর্মকর্তারা প্রথমে খানিকটা বিস্মিতই হন। কারণ, প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের নিজের নামে উল্লেখযোগ্য কোনো অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের নামে মিলেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।

দুদকের অভিযোগ, এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া কাজ দেখানো এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই অর্থের উৎস আড়াল করতে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়।

বুধবার বিকেলে পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেছেন সংস্থাটির উপসহকারী পরিচালক পার্থ চন্দ্র পাল। মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, তাঁর স্ত্রী রীনা পারভীন এবং দুই ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমনকে।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী রীনা পারভীন একজন গৃহিণী। তাঁর নিজস্ব কোনো পেশা বা আয়ের উৎস নেই। তবু তাঁর নামেই পাওয়া গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।

পটুয়াখালী পৌরসভার আরামবাগ এলাকায় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তাঁর নামে নির্মিত হয়েছে একটি তিনতলা ভবন। ঢাকার পান্থপথে ফেয়ার দিয়া কমপ্লেক্সে প্রায় ৪৭ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট।এর বাইরে পশ্চিম আগারগাঁওয়ের আবেদীন ড্রিমস প্রকল্পে দুটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্যও পেয়েছে দুদক। সব মিলিয়ে জমি, ফ্ল্যাট ও ভবনসহ প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে তাঁর নামে।

এর বাইরে ব্যাংক সঞ্চয়, গাড়ি ক্রয় ও ব্যবসার মূলধন মিলিয়ে আরও প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের হিসাব মিলেছে।দুদকের হিসাবে, রীনা পারভীনের গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মাত্র প্রায় ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ফলে প্রায় ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদ তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্ত্রীর পর এবার নজর পড়ে দুই ছেলের দিকে। মামলার নথি বলছে, মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত ও ফজলে রাব্বি রিমন সম্পদ অর্জনের সময় দুজনই ছাত্র ছিলেন। তাঁদের কোনো পেশা বা নিজস্ব আয় নেই। তবু তাঁদের নামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেন।দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বড় ছেলে রিফাতের নামে প্রায় ১২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং ছোট ছেলে রিমনের নামে প্রায় ১২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।

অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রিফাতের নামে প্রায় ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং রিমনের নামে প্রায় ৭৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। সব মিলিয়ে দুই ছেলের নামে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব উঠে এসেছে।

দুদকের অভিযোগ, অবৈধ অর্থের উৎস আড়াল করতে বড় ছেলে রিফাতের নামে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ছোট ছেলে রিমনের নামে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে।

এমনকি তাঁদের নামে আয়কর নথিও খোলা হয়েছে, যদিও বাস্তবে কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে পিরোজপুরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত ইতিমধ্যে আসামিদের নামে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

দুদকের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এখনো নিয়োগ করা হয়নি। সেই প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত শুরু হলে আরও সম্পদের তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

প্রকৌশলীর নিজের নামে বড় সম্পদের খোঁজ না মিললেও পরিবারের নামে কোটি টাকার হিসাব এখন দুদকের তদন্তের কেন্দ্রে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জৈন্তাপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে ১ জনের কারাদণ্ড, উপজেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে চসিক মেয়র

পাটুরিয়াঘাট এলাকা থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী আটক

বগুড়ায় ৪ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএমএসএস

খেলাধুলা তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন

কালুখালীতে ৯ম শ্রেণীর স্কুলছাত্রীকে মাইক্রোবাসে অপহরণের অভিযোগ, এলাকায় চাঞ্চল্য। বিপ্লব কুমার, রাজবাড়ী

মানিকগঞ্জে ট্রলি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষ: অ্যাডভোকেট সাদিকুল ইসলাম সোহা আহত

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজশাহী আঞ্চলিক কেন্দ্রসহ চার উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

চিকিৎসা নাকি হয়রানি? ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ভুক্তভোগী পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতা

বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন লিওনেল মেসি 

১০

মাদারগঞ্জে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে আশ্রয়ণ পুকুরে বালু উত্তোলন, দিনে-রাতে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা

১১

জিআই সনদ পেলো মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়

১২

অভিনেত্রী প্রভা ১৬ বছর পর এটা কি বললেন

১৩

অর্থের অভাবে মা’কে আনতে পারিনি- কেপ ভার্দের গোলরক্ষক

১৪

অসহায় বেলাল হোসেনের পাশে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর

১৫

সুবিধবাজারে নাশকতার অভিযোগে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৪ কর্মী আটক

১৬

চট্টগ্রামে যানজট কমাতে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই-ভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ চসিকের

১৭

পত্নীতলায় স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত লাগসই প্রযুক্তির সেমিনার ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

১৮

ময়মনসিংহে বিভাগীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১৯

শিবালয়ে ৪৫০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

২০

Design & Developed by BD IT HOST