
কালাম সিকদার জাফলং থেকে: সিলেটের সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র জাফলং আজ যেন এক নীরব জনপদে পরিণত হয়েছে। একসময় যেখানে পিয়াইন নদীর বুকে শত শত শ্রমিকের কোলাহল, নৌকার সারি আর পাথর-বালু উত্তোলনের ব্যস্ততা দেখা যেত, সেখানে এখন নেমে এসেছে হতাশা আর বেকারত্বের দীর্ঘশ্বাস। পরিবেশ রক্ষার নামে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাজারো শ্রমিক পরিবার চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে জাফলং এলাকার অধিকাংশ মানুষ পাথর ও বালু উত্তোলনের কাজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশগত কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা এখন কর্মহীন। সামনে ঈদুল আজহা, অথচ অনেক পরিবারের ঘরে নেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনার সামর্থ্যও।
শ্রমিকরা জানান, প্রতিদিন নদীতে কাজ করে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসা। এখন কাজ না থাকায় অনেকেই ঋণ করে জীবন চালাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে ছুটছেন। কিন্তু সবার ভাগ্যে কাজ জুটছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, পাথর শিল্প বন্ধ থাকায় পুরো জাফলং অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়ায় বাজারে ক্রেতা কমে গেছে, দোকানপাটে বিক্রি নেই। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিক—সবাই ক্ষতির মুখে।
জাফলং বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা হলেও এখানকার মানুষের বড় একটি অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে পাথর শিল্পকে ঘিরে। পিয়াইন নদী ও ডাউকি সীমান্ত এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে পাথর সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন স্থানীয়রা।
তবে পরিবেশবাদীদের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর নাব্যতা, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ড্রেজার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অবৈধ উত্তোলনে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠে।
এদিকে শ্রমিকরা বলছেন, “পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের বাঁচার ব্যবস্থাও করতে হবে। কাজ না থাকলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।” তারা সরকারের কাছে নিয়ন্ত্রিতভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের সুযোগ অথবা বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পরিবেশ রক্ষা এবং শ্রমিকদের জীবিকার মধ্যে সমন্বয় করেই টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায় জাফলংয়ের হাজারো পরিবার আরও গভীর মানবিক সংকটে পড়বে।
প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত জাফলং আজ যেন শ্রমিকদের কান্না আর হতাশার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে ঈদ, কিন্তু অনেক পরিবারেই নেই আনন্দের প্রস্তুতি—আছে শুধু অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST