
অনলাইন ডেস্কঃ ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও, সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দরে থামেনি লুটপাটের মহোৎসব। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল খোলস পালটেছে, কিন্তু বদলায়নি দুর্নীতির চিত্র। বিগত আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ‘মাফিয়া চক্র’ এখন নতুন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আরও বেপরোয়া। তামাবিল স্থলবন্দর, কোয়ারী এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো যেন পরিণত হয়েছে চোরাচালান, চাঁদাবাজি আর রাজস্ব ফাঁকির এক অভয়ারণ্যে। এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে উঠে এসেছে ঢাকাইয়া ‘ডেভিল দুর্জয়’, চোরাকারবারি রাসেল, দুর্নীতিবাজ বন্দর কর্মকর্তার এবং সিলেট জেলা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার নাম। আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী এবং বর্তমানে সিলেটে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাসকারী তথাকথিত ব্যবসায়ী ‘ডেভিল দুর্জয়’ তামাবিলে গড়ে তুলেছেন এক দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘ডেভিল দুর্জয়’, চোরাকারবারি ‘রাসেল’, জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক, ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ ইসমাইল ইসলাম, জৈন্তাপুর উপজেলা তাতী দলের আহ্বায়ক মিসবাহ, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপি নেতা ইলিয়াস উদ্দিন লিপু এবং তামাবিল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) আবু রায়হান চৌধুরীসহ ১৫ সদস্যের এক সমন্বিত চক্রের যোগসাজশে চলছে এই লুটপাট।
এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো ধরনের কাস্টমস এন্ট্রি ছাড়াই অত্যন্ত সুকৌশলে এ পর্যন্ত ১৪টি পণ্যবাহী গাড়ি পার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারের প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাজস্ব সরাসরি আত্মসাৎ করেছে এই চক্র। ভারত থেকে বৈধ পথে আসা ৩০ টনের অধিক মালামাল এবং পাথর, শিলাসহ বিলাসবহুল পণ্য কোনো প্রকার কাস্টমস ট্যাক্স ছাড়াই ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থলবন্দরের জোরদারবিধি করে আন্দোলন করার পর প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তা বাংলাদেশি ট্রাকে লোড হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
কাস্টমস ফাঁকির পাশাপাশি এলসি (LC) পাথরের ট্রাকেও চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। প্রতিদিন বন্দর থেকে বের হওয়া প্রায় ৭০০ ট্রাক থেকে ৪৫০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, কেবল পাথর পরিবহন থেকেই প্রতিদিন ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকার প্রকাশ্য লুটপাট চলছে। বিপুল পরিমাণ এই অবৈধ অর্থ ভাগাভাগিটায় চলে যাচ্ছে চিহ্নিত মহলের পকেটে, আর প্রশাসনের নাকের ডগায় বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বেড়াচ্ছে এই মাফিয়া চক্র।
সরকার পতনের পর সিলেট-৪ আসনের সাবেক এমপি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ মনি মোকাবার (অর্থ জোগানদাতা) এবং আওয়ামী যুবলীগ নেতা দিলীপকুমার, ঠিক তখনই তাদের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম (শাহজাহান)। শোনা যাচ্ছে, গত ৬ আগস্ট রাতে এক গোপন বৈঠকে দুর্জয়ের মাধ্যমে দখল আদায়ের শর্তে ২ কোটি টাকা নগদ আদায় করেন তিনি। শুধু এখানেই নয়, জাফলংয়ের পাথর কোয়ারি ও তামাবিল স্থলবন্দরের পুরোনো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে দেন তিনি। গত ১৫ বছর ধরে যারা সাধারণ ব্যবসায়ীদের রক্ত চুষে খেয়েছে, তাদের পুনর্বাসন মরিয়া হয়ে উঠেছেন এই বিএনপি নেতা। তবে এসব অপকর্মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়ায়, দলের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার মুখে পড়া এই ‘শেল্টারদাতা’ নিজেই এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন, পরিণত হয়েছেন নির্বাসিত সর্বহারা।
তামাবিল স্থলবন্দর এলাকা, নলজুড়ী, খাসি হাওর ও সোনাটিলাগুলোতে আরেক অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক নিজেকে ‘বড় ব্যবসায়ী’ দাবি করা রাসেল। বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তার করা রাসেল ৫ আগস্টের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও, সম্প্রতি আবারও স্বরূপে ফিরেছেন। স্থানীয় সূত্র ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাসেল এই সীমান্ত এলাকাকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে মানবপাচার, মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ ভারতীয় পণ্যের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। তার একক আধিপত্য ও পেশিশক্তির কাছে পুরো তামাবিলের ব্যবসায়ীরা আজ জিম্মি। বন্দরের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশ ধ্বংস করে তিনি একে নিজের অপরাধের আখড়ায় পরিণত করেছেন।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শাহজাহান ও ‘ডেভিল দুর্জয়’ এবং রাসেল এর ব্যক্তিগত সেলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, সীমান্ত সুরক্ষা ও স্থলবন্দরের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল। বৈধ ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই মাফিয়া চক্রের অবৈধ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। তারা অবিলম্বে সোজাসমিন তদন্ত করে দুর্জয়, রাসেল ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইন ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সুএ- দৈনিক তদন্ত রিপোর্ট
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST