

সাব্বির হাসান জাহিদ, রাজশাহী থেকে : রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার হাটকানপাড়া হাট-বাজারে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত নতুন শেডে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার নামে হাট ইজারাদারের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুদ্র ও স্বল্প পুঁজির একাধিক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সরকারি প্রায় ১০ লক্ষ্য টাকা ব্যায়ে শেডটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নির্মিত ওই শেডে দোকান বরাদ্দের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগের তদন্ত এবং নেওয়া টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (১০ আগস্ট) অভিযুক্ত হাট ইজারাদার জীবন আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হাটকানপাড়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেনসহ কমিটির কয়েকজন সদস্য। অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পুরোনো ও নতুন ব্যবসায়ীদের আটচালা বা জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার নামে ইজারাদার জীবন আলী ইতিমধ্যে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ভুক্তভোগীদের অডিও-ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) হাটকানপাড়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেনের কাছে একাধিক ব্যবসায়ী মৌখিক অভিযোগ করেন। একই বিষয়ে নজরুল ইসলাম নামের এক দোকানি লিখিত অভিযোগ দেন। পরে বণিক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেনসহ কমিটির কয়েকজন সদস্য সরেজমিনে বিষয়টি তদন্ত করেন। ব্যবসায়ীরা কে কত টাকা ইজারাদারকে দিয়েছেন—এ-সংক্রান্ত ভিডিও বক্তব্যও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাটকানপাড়া উপজেলার অন্যতম পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বাজার। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার ও সোমবার এখানে হাট বসে। চলতি অর্থবছরে সরকারি ডাকের মাধ্যমে হাটটি ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা জীবন আলী। অভিযোগ রয়েছে, জীবন আলী ও তাঁর সহযোগী সুমন এবং রফিকুল স্বর্ণকার দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দোকান বরাদ্দের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি নেওয়ার পাশাপাশি দোকানের অবস্থান ও ধরন অনুযায়ী ২০ হাজার, ৩০ হাজার, ৪০ হাজার, ৭০ হাজার টাকা এমনকি ১ লাখ টাকারও বেশি নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্মিত শেডে মোট ১৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ১২টি দোকানে ব্যবসা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, শেড নির্মাণের আগে ওই জায়গায় দীর্ঘ ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে কয়েকজন কামার, পোশাক, পান-সুপারি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার ব্যবসায়ী দোকান করে আসছিলেন। তাঁদের কয়েকজনকে আগের জায়গায় দোকান না দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ব্যবসায়ীদের জায়গায় অন্য ব্যবসায়ীদের দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
হাটকানপাড়া বাজারের প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো কামার ব্যবসায়ী কর্মকার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যে জায়গায় দোকান করে সংসার চালিয়েছি, নতুন শেড নির্মাণের পর সেই জায়গায় আমাকে দোকান দেওয়া হয়নি। অন্য জায়গায় দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে আমার কাছেও ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। হাটে সপ্তাহে দুদিন দোকান করি। অল্প আয় হওয়ায় সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। পরে এনজিও থেকে কিস্তিতে ঋণ নিয়ে ওই টাকা দিতে হয়েছে।’
নতুন শেডে দোকান বরাদ্দ পাওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বণিক সমিতির সভাপতি ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে তাঁরা ইজারাদারকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক মিষ্টি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার, এক কামার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২০ হাজার, মসলা বিক্রেতার কাছ থেকে ২০ হাজার, পোশাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং দড়ি-সুতার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া একজন মিষ্টি বিক্রেতার কাছ থেকে তুলনামূলক ভালো জায়গায় দোকান দেওয়ার কথা বলে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কম টাকা দেওয়ায় দোকানের জন্য ভালো জায়গা পাইনি। ইজারাদারের চাপের কারণে অনেকটা অশান্তির মধ্যেই ব্যবসা করতে হচ্ছে।’
হাটকানপাড়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দোকান বরাদ্দের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা কমিটির কয়েকজন সদস্য সরেজমিনে তদন্ত করেছি। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। দোকান বরাদ্দের নামে কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট হাট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাট ইজারাদার জীবন আলী। তিনি বলেন, ‘দোকান বরাদ্দের নামে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি। আমার বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত বিষয়টি দেখবে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে এলাকার কিছু ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন।’
দুর্গাপুর উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঠিকাদারের মাধ্যমে শুধু শেডটি নির্মাণ করে দিয়েছি। দোকান বরাদ্দ বা ইজারার বিষয়টি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।’ সরকারি শেডে দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো ফি বা জামানতের নিয়ম রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের বিষয় নয়।’
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে হাট ইজারাদারের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি অর্থায়নে নির্মিত শেডে দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST