
মোহাম্মদ আনিছুর রহমান ফরহাদ, ব্যুরো চীফ, চট্টগ্রাম
১০ লাখ কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অঙ্গীকার ,চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতি ৬ জন বাসিন্দার মধ্যে ১ জনের কাছে ব্র্যাকের সেবা পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি, দুর্যোগ ও সঙ্কট মোকাবিলা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন (ওয়াশ), জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, অভিবাসন এবং দক্ষতা উন্নয়নসহ নানাক্ষেত্রে এসব সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরে ব্র্যাক সারা দেশে ১০ লাখ মানুষের কর্ম কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি নারী ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে।
চট্টগ্রাম বিভাগে কর্মরত ১৫ হাজার ৯৮৪ জন কর্মী ব্র্যাকের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছেন, এদের মধ্যে ৩৭ শতাংশই নারী। এই বিভাগে সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৯১৫টি কার্যালয় এবং সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগের ৩৯টি কার্যালয়ের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে ব্র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ তারিখে নগরীর স্থানীয় একটি হোটেলের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন। ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি, কমিউনিকেশনস ও এনগেজমেন্ট-এর ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ চট্টগ্রাম বিভাগে ব্র্যাকের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম, আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে তাদের বক্তব্য ও মতামত প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামকে সাসটেইনেবল সিটি বা টেকসই নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ব্র্যাককে সহায়তার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নগরীর বর্জ্য ব্যস্থাপনা কার্যক্রমে ব্র্যাক সিটি করপোরেশনকে সহায়তা দিতে পারে। এছাড়া কিশোর গ্যাং, মাদক এবং সন্ত্রাসের মতো সামাজিক ব্যাধী থেকে রক্ষায় কিশোর ও তরুণদের জন্য খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ বলেন, ব্র্যাকের কর্মকাণ্ডের ৮০ ভাগের বেশি নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়, দাতাদের সহায়তা ১৮ থেকে ১৯ ভাগ। ব্র্যাক তাই নিজেদের সিদ্ধান্তেই দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে উন্নয়নমূলক যে কোনো কাজ হাতে নিতে পারে। এ জন্য কারো অনুমোদন বা পরামর্শের প্রয়োজন হয় না। ব্র্যাকের বিস্তৃতি আজ বিশ্বজুড়ে, তবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষ। ব্র্যাকের জন্ম বাংলাদেশে, এটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, ব্র্যাকের অন্যতম দর্শন হচ্ছে, মানুষের ভেতরের অমিত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা এবং তা এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করা।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাঠান মোঃ সাইদুজ্জামান (শিক্ষা ও আইসিটি) বলেন, সরকারের পর যে প্রতিষ্ঠানটি তৃণমূলে সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত, সেটি হচ্ছে ব্র্যাক। ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ যুব সমাজ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের ৭০ ভাগ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। এ থেকে পত্রিাণ পেতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হেলথ এডুকেশন বা স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজন, যেখানে ব্র্যাক এগিয়ে আসতে পারে।
চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক মোঃ নাজিমুল হক বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পচ্ছিন্নতাসহ নানা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে এনজিওগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। সেই ধারাবাহিতা রক্ষার জন্য তিনি ব্র্যাকসহ দেশের সকল এনজিওর প্রতি আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক, স্বাস্থ্য, ডা. শেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ্য মুহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, পাবলিক প্রসিকিউটর মফিজুল হক ভূঁইয়া, নারী উদ্যোক্তা সুলতানা জাহান, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি এবং এনসিপি-র চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইফরাত ইব্রাহিম প্রমুখ।
ব্র্যাকের সমন্বিত কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার আঞ্জুমান আরা বেগম চট্টগ্রামে বিভাগে ২০২৫ সালে ব্র্যাকের কর্মসূচিগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ হাজার ৫০৭টি অতি-দরিদ্র পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে এবং ১০ হাজার ৩৯৪টি পরিবার অতিদারিদ্র্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু-সহনশীলতা বিষয়ে সহায়তা পেয়েছেন ৯ হাজার ৪৬৪ জন এবং ৪৭১জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন। মাইক্রোফইন্যান্সের আওতায় আর্থিক সেবা পেয়েছেন ২৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৫ জন সদস্যের মধ্যে ৮৯.৮ শতাংশ নারী। এছাড়া ১ হাজার ১৭৬ জন বেকার যুবককে উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে ২ লাখ ৩ হাজার ৮২২ জন সেবা পেয়েছেন। এছাড়া ১৩ হাজার ৬৬৬ জন গর্ভবতী নারী পূর্ণাঙ্গ প্রসবপূর্ব সেবা পেয়েছেন এবং ৭ হাজার ২১৩টি নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৮ হাজার ৬০৪ জনের চক্ষু পরীক্ষা এবং ১০ হাজার ১১৯টি চশমা বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহনশীলতা, নারী ও পুরুষের সমঅধিকার, সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্র্যাকের গত এক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST