বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, রাজবাড়ীঃ
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. তাজমুন্নাহারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও ঘুষ গ্রহণের নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তবে অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি অভিযোগের পরও তিনি জবাবদিহির বাইরে?
জানা গেছে, মোছা. তাজমুন্নাহার ২০২৫ সালের ১০ মে বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করে আসছেন শিক্ষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, নিয়মিত মাসিক সমন্বয় সভা যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তাদের দাবি, গত দুই মাসে মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ এ ধরনের সভায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের জানানো হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, FLN (Foundational Literacy and Numeracy) যাচাই, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, শিক্ষক বদলি ও দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমন্বিতভাবে নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও নিয়মিত সভা না হওয়ায় শিক্ষকরা বিভ্রান্তিতে পড়ছেন।
এদিকে বালিয়াকান্দি উপজেলায় FLN যাচাইয়ের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অনুমাননির্ভর বা অতিরঞ্জিত তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, ২০২৬ সালের মূল্যায়ন নির্দেশিকায় বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের কথা থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে নির্দেশিত কাঠামো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং কিছু প্রশ্নের মান বণ্টন নিয়েও অসঙ্গতি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র বাবদ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, এ কারণে বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
শিক্ষকদের অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন বিল, PRL ফাইল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক অভিযোগ করেন, PRL ফাইল আটকে রেখে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি মাহবুবুল হক নামে এক প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
একাধিক শিক্ষক দাবি করেন, অতীতেও তাজমুন্নাহারের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে শিক্ষকরা প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেছিলেন। এমনকি তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করবেন না মর্মে লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক বলেন, “তার বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন। কেউ অভিযোগ করলে তাকে বিভিন্নভাবে কোনঠাসা করার আশঙ্কা থাকে।”
শিক্ষকদের অভিযোগ, শুধু প্রান্তিক মূল্যায়ন নয়—গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট, প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমেও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের একক সিদ্ধান্ত ও স্বেচ্ছাচারিতা রয়েছে।
একজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিনি যেন প্রতিটি বিলের মধ্যেই টাকার গন্ধ খুঁজে পান।”
এদিকে বালিয়াকান্দি উপজেলার শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের দাবি, বেজলাইন সার্ভে এবং সাবলীলভাবে পড়তে অক্ষম শিশুদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর ও সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা তারা পাচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. তাজমুন্নাহারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষকদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এত অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর তদন্ত করছে না? নাকি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এসব অভিযোগও ফাইলবন্দি হয়েই থাকবে? সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে আসুক—এটাই প্রত্যাশা শিক্ষক ও অভিভাবকদের।মন্তব্য করুন
Design & Developed by BD IT HOST